Search This Blog

Saturday, January 28, 2017

লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা

লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা


ভূমিকা: একটি জাতির প্রাণ বলা হয় সে দেশের জাতীয় সঙ্গীতকে, আর পতাকা হলো সে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। জাতীয় সঙ্গীতের চেয়ে মধুর সঙ্গীত একটি ভাষাভাষী মানুষের কাছে আর কিছুই হতে পারে না। জাতীয় চেতনার সমন্বয়ক এবং আত্মচেতনার প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গীত। স্বাধীনতা পরবর্তী এবং স্বাধীনতার সময় আমাদেরকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। এই সঙ্গীতকে ঘিরে বাঙালি জাতির আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। আর তাই স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর স্বাধীনতা দিবসে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছে বাংলাদেশের মানুষ। সম্মিলিত প্রচেষ্টার এই উদ্যোগ আমাদের প্রাণে সুর হয়ে বাজবে বহুকাল।

আয়োজনের উদ্যোগ: গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানোর প্রত্যয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই অনন্য আয়োজনের উদ্যোগ নেয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতীয় সঙ্গীতকে ঘিরে এমন বর্ণাঢ্য আয়োজন ছিল এই প্রথম। আর তাই বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজন করা হয় লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার এই মহতী কর্ম। এটি জাতিকে বিশ্ব দরবারে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়।

প্রস্তুতি পর্ব: একমাস ধরে সারা দেশে লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলাকর্মসূচি নিয়ে কর্মতৎপরতা চলে। শুদ্ধ করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্য, সঠিক সুরে গাওয়া জাতীয় সংগীতের অডিও রেকর্ড শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। সেই অডিও থেকে সঠিক সুরে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার প্রশিক্ষণ ও মহড়া হয়েছে সারা দেশে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সহায়তায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই আয়োজনটি বাস্তবায়ন করেছে। শুধু প্যারেড গ্রাউন্ড নয়, একই সময়ে সারাদেশের কোটি কোটি মানুষও কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়েছেন আমার সোনার বাংলা গানটি। দেশের বাইরে অবস্থান করা বাংলাদেশিরাও এসময় গলা মিলিয়েছেন টেলিভিশন, ইন্টারনেটের কল্যাণে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের ৪৩তম বার্ষিকীতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে রচিত হলো এই নতুন ইতিহাস ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮১ জন নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, তাদের মাঝে উপস্থিত দেশের প্রধানমন্ত্রী, সবার কণ্ঠেই এক সুর-আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

প্যারেড গ্রাউন্ডে যাত্রা:সকাল ছয়টা থেকে প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করতে শুরু করে মানুষ। দীর্ঘ লাইন ধরে প্যারেড গ্রাউন্ডের ভেতরে প্রবেশ করেন নানা শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষ। অনেকেই মাঠে আসেন গায়ে পতাকা জড়িয়ে, মাথায় পতাকা বেঁধে। আয়োজনটিতে মেশিনে গণনা অনুযায়ী মানুষের অংশগ্রহণের সংখ্যা ছিলো ২,৫৪,৬৮১ জন। আয়োজকদের পক্ষ হতে জানানো হয়েছে যে রেকর্ড গড়ার জন্য গিনেস কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত সকল শর্ত সূচারুরূপে পালিত হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক গণনার বাইরেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলো ৩,২৫,০০০ এর অধিক মানুষ। অনুষ্ঠানস্থলে যোগ দিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সমবেত হয় প্যারেড গ্রাউন্ড চত্বরে। সকালের আকাশে সূর্য কিরণ ফুটে উঠার আগেই নানা শ্রেণি পেশার মানুষ প্যারেড গ্রাউন্ড অভিমুখে যাত্রা করে। এর ভিতরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গার্মেন্টস কর্মী এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। মানিক মিয়া এ্যাভিনিউ থেকে সামরিক বাহিনীর একজন সদস্যের নেতৃত্ব ১৫০ জন মানুষের একটি করে টিম সুশৃঙ্খলভাবে প্যারেড গ্রাউন্ড অভিমুখে যাত্রা করে। অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার এই আয়োজনকে শতভাগ সফল করেছে। বয়সের বাধা উপেক্ষা করে ইতিহাসের অংশ হতে হাজির হয়েছিলেন বহু মুক্তিযোদ্ধা, যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বর্ষীয়ান অনেক মানুষ।

যেমন ছিল প্যারেড গ্রাউন্ড: প্যারেড গ্রাউন্ডের নির্ধারিত স্থানটি ১৫টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। সেক্টরগুলো বিভক্ত ছিল অনেকগুলো ব্লকে। অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে একটি করে ক্যাপ ও ব্যাগ দেয়া হয়। ব্যাগে ছিল জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত ও নিয়মাবলী লেখা সংবলিত একটি কার্ড, পানি, জুস, শুকনো খাবার ও স্যালাইনসহ তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ওষুধপ্রতিটি সেক্টরে একটি করে বড় স্ক্রিনে কিছুক্ষণ পরপরই জানিয়ে দেয়া হচ্ছিল মাঠের পরিস্থিতি আর উপস্থিতি। মঞ্চে ছিল শিল্পীদের নানা আয়োজন। মঞ্চের ঘোষণা অনুযায়ী সবাই গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন কি-না এবং রেকর্ডের জন্যে অন্যান্য নিয়মাবলী ঠিকমতো পালিত হচ্ছে কি-না তা দেখতে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডস রেকর্ডের প্রতিনিধিরা এ অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করেছেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সুরকার স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দসৈনিক সুজেয় শ্যাম।বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে।

উপস্থিতি ও প্রস্তুতি পর্ব: মূল পর্বের আগে সকাল ৮টা থেকে শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় দেশবরেণ্য এবং খ্যাতনামা শিল্পীদের অংশগ্রহণে মাঠে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। চূড়ান্ত জাতীয় সংগীত পরিবেশনের আগে পৌনে ১১টায় হয় দুই দফা অনুশীলন হয় যাতে প্রধানমন্ত্রীও অংশ নেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানসহ সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা।

লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা: বেলা ১১ টা ২০ মিনিটে এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। মাইকে ঘোষণা এলো এখনই শুরু হবে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার কার্যক্রম। সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনাকালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ হতে অংশগ্রহণ করেন ফাহিম হোসেন চৌধুরী, মীতা হক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, রাইসা আহমেদ লিসা, তপন মাহমুদ, সাজেদ আকবর, সালমা আকবর, লিলি ইসলাম, ফাতেমাতুজ জোহরা, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, তিমির নন্দী, বুলবুল মহলানবীশ, আব্দুল জব্বার, মহিউদ্দীন চৌধুরী, ইয়াকুব আলী খান, খায়রুল আনাম শাকিল, শাহীন সামাদ, সুজিত মোস্তফা, সুমন চৌধুরী, ফরিদা পারভীন, চন্দনা মজুমদার এবং ফকির আলমগীরের মতো দেশ বরেণ্য শিল্পীরা। ঘড়ির কাটায় সকাল ১১টা ২০ মিনিটে রাজধানীর তেজগাঁও জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয়- আমার সোনার বাংলা’, আমি তোমায় ভালোবাসি’...বাংলাদেশ আর বাংলাদেশিদের প্রাণের এ সুর ছড়িয়ে পড়ে প্যারেড গ্রাউন্ডের বাইরে, সারা বাংলাদেশে। পুরো পৃথিবীজুড়ে যেখানে যতো বাংলাদেশি রয়েছেন তারাও কণ্ঠ মেলালেন লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া জাতীয় সংগীতে।

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডস রেকর্ডের স্বীকৃতি: ৯ এপ্রিল, ২০১৪ সর্বাধিক মানুষের অংশগ্রহণে জাতীয় সংগীত গাওয়ার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ৯ এপ্রিল, ২০১৪ GUINNESS WORLD RECORDS কর্তৃপক্ষ এই স্বীকৃতি প্রদান করেআনুষ্ঠানিকভাবে দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮১ জন সম্মিলিত কণ্ঠে মূল অনুষ্ঠান স্থলে সমবেত কণ্ঠে গানটি গেয়েছেন। লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে ৪৪তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে বাংলাদেশ উঠে গেল নতুন এক মর্যাদার উচ্চ শিখরে। পাশাপাশি লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার বিশ্ব রেকর্ড তৈরি করে বাংলাদেশের নাম উঠল গিনেজ রেকর্ডে। যা বাঙালি জাতিকে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রেরণা জোগাবে যুগ যুগ ধরে।

উপসংহার: দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাঙালি জাতি নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতার সোনালি সূর্য, বিজয়ের লাল সবুজ পতাকা। মুক্তিযোদ্ধারা বুকের পাজরে বুলেটের তাজা ক্ষত নিয়েও অম্লান রেখেছে দেশমাতৃকার সম্মান। ৪৪তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সেইসব বীর সেনানীদের শ্রদ্ধা জানাতে, দেশের মানুষকে নতুন করে দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে ২৬ মার্চ, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের প্রায় তিন লাখ মানুষ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সমবেত হয়ে একযোগে জাতীয় সংগীত গেয়েছে। যা পরবর্তীতে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডস রেকর্ডে স্থান করে নেয়।

বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য, ধান

বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য
ধান

ভূমিকা: ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য। আমরা ধান থেকে তৈরি ভাত খেয়ে জীবন ধারণ করি। পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ লোক অন্নভোজী। বাংলাদেশে ধানের চাহিদা প্রচুর। বিভিন্ন উপায়ে এই ক্রমবর্ধমান চাহিদার পূরণ করা হচ্ছে। ভারতীয় উপমহাদেশে হাজার হাজার বছর ধরে চলেছে এই ধান চাষ। ধানের সঙ্গে আর কোনো কৃষিজাত দ্রব্যেরই তুলনা করা যায় না।

ধান চাষের উৎপত্তি: ধান (বৈজ্ঞানিক নাম oryza sative) Graminae / poaceae গোত্রের দানাশস্য উদ্ভিদ। ধান উষ্ণ জলবায়ুতে, বিশেষত পূর্ব-এশিয়ায় ব্যাপক চাষ হয়। ধানবীজ বা চাল সুপ্রাচীন কাল থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রধান খাদ্য। চীন ও জাপানের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ১০,০০০ বছর আগে ধান চাষ হয়েছিল বলে জানা যায়।

ধান গাছের বর্ণনা: ধান গাছ সাধারণত ১-১.৮ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। এর পাতা সরু, লম্বা আকৃতির হয়। পাতা ৫০-১০০ সে.মি (২০-৩৯ ইঞ্চি) পর্যন্ত লম্বা ও ২-২.৫ সে.মি. (০.৭৯-০.৯৮ ইঞ্চি) প্রশস্ত হয়ে থাকে। সাধারণত বায়ুর সাহায্যে এর পরাগায়ন হয়ে থাকে। পুষ্পমঞ্জরীতে ফুলগুলোর শাখান্বিত অবস্থান উপর থেকে নীচ পর্যন্ত সাজানো থাকে। এক একটি পুষ্পমঞ্জরী ৩০-৫০ সে. মি. (১০-২০ ইঞ্চি) লম্বা হয়ে থাকে। এর বীজকে খাবার হিসাবে খাওয়া হয়, একে শস্য বলা হয়। প্রথমে ধান সজুব বর্ণের থাকে। ধান পাকলে সোনালি বর্ণ ধারণ করে।

জন্ম স্থান: বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, চীন, জাপান, শ্রীলংকায় প্রচুর ধান জন্মে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই কম বেশি ধান জন্মে। বাংলাদেশের সর্বত্র ধান জন্মে। তবে বাংলাদেশের বরিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা, দিনাজপুর, সিলেট, জামালপুর ও ময়মনসিংহে অনেক বেশি ধান জন্মে।

ধান চাষের জন্য বীজতলা: ধান চাষ করতে হলে প্রথমে বীজতলা তৈরি করতে হয়। সেখানে বীজ ছিটিয়ে রেখে কয়েক দিন সেচ দিতে হয়। তারপর ছোট চারাগুলোকে তুলে মূল জমিতে রোপন করা হয়। তাছাড়া সরাসরি বীজ জমিতে ছিটিয়েও চাষ করা হয়।

শ্রেণিভেদ: বাংলাদেশে রয়েছে হরেক রকমের ধানের জাত। এর মধ্যে ফসলভেদে ধানকে আউশ, আমন ও বোরো এই তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়ে থাকে। প্রত্যেক প্রকারের আবার নানা রকম নামও হয়ে থাকে। যেমন- লক্ষ্মীবিলাস, কালাজিরা, মানিদীঘি ইত্যাদি। বর্তমানে ইরি জাতের ধানের ব্যাপক চাষ হচ্ছে।

বাংলাদেশে ধানের মৌসুম: চাষের সময়ের উপর নির্ভর করে বাংলাদেশের ধানকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। এই প্রধান তিনটি ভাগ হলো আউশ, আমন ও বোরো।

আউশ ধান: দ্রুত (আশু) ফসল উৎপন্ন হওয়ার বিচারে এই ধানের নামকরণ করা হয়েছে আউশ। এই ধান সাধারণত আষাঢ় মাসে জন্মে। এই কারণে এর অপর নাম আষাঢ়ী ধান। তবে এই ধান বৎসরের যেকোনো সময়েই চাষ করা যায়। বাংলাদেশে তৈরি আউশ ধানের বিভিন্ন জাতগুলো হলো- হাসিকলমি, সূর্যমুখ, শনি, ষাইটা, আটলাই, কটকতারা, কুমারি, চারণক, দুলার, ধলাষাইট, ধালাইল, পটুয়াখালি, পানবিড়া, কালামানিক, কালা বকরি, ভইরা, ভাতুরি ইত্যাদি।

আমন ধান: আমন হেমন্ত ঋতুর ধান। আমন ধান তিন প্রকারের। যথা:-

রোপা আমন: চারা প্রস্তুত করে, সেই চারা রোপন করে এই ধান উৎপন্ন হয় বলে এর নাম রোপা আমন। রোপা আমন জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে বীজ তলায় বীজ বোনা হয়শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে মূল জমিতে রোপণ করা হয় এবং অগ্রহায়ণ-পৌষ মাসে ধান কাটা হয়।

বোনা আমন: এই আমন ছিটিয়ে বোনা হয়। বোনা আমন চৈত্র-বৈশাখ মাসে মাঠে বীজ বপণ করা হয় এবং অগ্রহায়ণ মাসে পাকা ধান কাটা হয়। একে আছড়া আমনও বলে।

বাওয়া আমন: বিল অঞ্চলে এই আমন উৎপন্ন করা হয়। এই কারণে একে গভীর পানির বিলের আমনও বলা হয়ে থাকে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রজাতির আমন ধান চাষ হয়ে থাকে এবং প্রতিটি প্রজাতির ধানের স্থানীয় নাম রয়েছে। যেমন- চিংড়ি খুশি, চিটবাজ, ইন্দ্রশাইল, কাতিবাগদার, ক্ষীরাইজালি, নাজিরশাইল, বাঁশফুল, ঢেপি, বাদশাভোগ, ভাসা মানিক, বাইশ বিশ, দুধলাকি, ধলা আমন, ঝিঙ্গাশাইল, রাজাশাইল, রূপশাইল, লাটশাইল, হাতিশাইল, গদালাকি, গাবুরা, জেশোবালাম ইত্যাদি।

বোরো ধান: বোরো ধান প্রধানত সেচ নির্ভর। কার্তিক মাস থেকে বীজ তলায় বীজ বপণ শুরু হয়। ধান কাটা চলে বৈশাখ-জৈষ্ঠ্য পর্যন্ত। উচ্চ ফলনশীল বোরো ধান প্রবর্তনের পর থেকে ধান আবাদ তথা সমুদয় কৃষি ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বসন্তকালে এই ধান জন্মে বলে একে বাসন্তিক ধানও বলা হয়। এই জাতের ধানের নামগুলো হলো আমন বোরো, কৈয়াবোরো, টুপা, পশুশাইর, বানাজিরা, কেরোবোরো ইত্যাদি।

ধানের প্রক্রিয়াজাতকরণ: ধান কাটার পর সাধারণত একে রোদে শুকানো হয়। রোদে শুকিয়ে এর বীজের আদ্রতা কমিয়ে আনা হয় যেন, একে সংরক্ষণ করার পর কোনো ছত্রাক জাতীয় রোগ আক্রমণ না করতে পারে। এরপর ঢেঁকি বা যন্ত্রের সাহায্যে এর খোসা ছাড়ানো হয়। এ পদ্ধতিকে ইংরেজিতে বলা হয় হাস্কিং।

ধানের পুষ্টিগুণ: ধানে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের পুষ্টি উৎপাদন। যথা-

উপাদান পরিমাণ ১০০ গ্রামে
পানি ১২
কার্বোহাড্রেট ৮০
শক্তি ১৫২৯ কিলোজুল
আমিষ ৭.১
স্নেহ ০.৬৬
আঁশ ১.৩
চিনি ০.১২
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট: বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান খাদ্য চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে নিত্য নতুন ধান উদ্ভাবনের চেষ্টায় নিয়োজিত সংস্থা BRRI (Bangladesh Rice Research institute)ঢাকার উত্তরে গাজীপুর জেলার জয়দেবপুরে এই সংস্থার সদর দপ্তর অবিস্থত। সারাদেশে এই ইনস্টিটিউটের ৯টি আঞ্চলিক কেন্দ্র রয়েছে। কেন্দ্রগুলো- কুমিল্লা, হবিগঞ্জ, সোনাগাজী, ভাঙ্গা, বরিশাল, রাজশাহী, রংপুর, কুষ্টিয়া এবং সাতক্ষীরায় অবস্থিত। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃতি উন্নত প্রজাতির ধান বেশির ভাগই করেছে- BRRI-এর বিজ্ঞানীরা।

ধানের উৎপাদন: বাংলাদেশে দিন দিন ধানের উৎপাদন বেড়েই চলেছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের তথ্য অনুযাযী ১৯৫০ -৫১ সালে দেশে চালের মোট উৎপাদন ছিল ৬২ লাখ টন। বীজ ও অপচয় বাবদ শতকরা ১০ ভাগ বাদ দেয়ার পর চালের নীট প্রাপ্যতা ছিল ৫৫ লাখ ৮০ হাজার টন। লোক সংখ্যা ছিল ৪ কোটি ২১ লাখ। ওই বছরে খাদ্যশস্যের ঘাটতির পরিমাণ ছিল সাড়ে ১১ লাখ টন। ১৯৬৫-১৯৭৫ সালে চালের উৎপাদনে তেমন বেশি পরিবর্তন হয়নি। চাল উৎপাদনের বার্ষিক পরিমাণ ছিল এক কোটি ৭ লাখ টন। ওই সময় দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। বর্তমানে ২০১৩-১৪ বর্ষে এসে ধানের উৎপাদন ৩ কোটি ৪০ লাখ টন। ১৯৭১-২০১৪ সাল এই ৪৩ বছরে দেশের জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। অন্যদিকে একই সময়ে এই ধানের উৎপাদন বেড়েছে তিনগুণ। এছাড়া ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট ছাড়াও বাংলাদেশে পরমাণু গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ১৪টি ধানের জাত উদ্ভাবন করেছে। যা কৃষকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় হয়েছে।

উপসংহার: ধান থেকে উৎপাদিত ভাত বাঙালির প্রধান খাদ্য। আমাদের দেশে ধান প্রধান খাদ্য হলেও আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ধান চাষ করতে পারছি না; কারণ এখনো আমাদের কৃষিপদ্ধতি প্রকৃতির উপর নির্ভরশীল। তারপরও বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে অনেক এগিয়েছে। সরকারের ব্যাপক সহযোগিতা পেলে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ আরো এগিয়ে যাবে



ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধ

ভাস্কর্যে মুক্তিযুদ্ধ

ভূমিকা: একটি জাতির গৌরব করার মতো যেসব বিষয় থাকে, তার মধ্যে অন্যতম হলো সে জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্য। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস বাঙালি জাতির অহংকার। বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস, ত্যাগ-তিতীক্ষা ও অবদান নতুন প্রজন্মকে জানাতে এবং ধরে রাখতে দেশব্যাপী তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য ভাস্কর্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ভাস্কর্য যেন তাই খুব ঘনিষ্ঠভাবে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত।

ভাস্কর্য: ভাস্কর্য এক ধরণের শিল্পকলা বিশেষ। এটি অবশ্যই ত্রি-মাত্রিক হয়। অর্থাৎ একটি ভাস্কর্যের অবশ্যই জ্যামিতি শাস্ত্রের ঘনকের ন্যায় দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা থাকতে হবে। এটি হতে পারে যেকোনো প্রাণী, জীবজন্তু, মানুষ কিংবা অন্য কোনো বস্তুর আদলে। মাটি, পাথর, কাঠ, সুরকি, ধাতব, কংক্রিট ইত্যাদি বিভিন্ন উপাদান দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করা হয়ে থাকে। পুতুল, মাটির জিনিসপত্র, মূর্তি, মুখোশ ইত্যাদি ভাস্কর্যের উদাহরণ।

ভাস্কর্য ও মুক্তিযুদ্ধ: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সাথে ভাস্কর্যের সম্পর্ক ঐতিহাসিক। মুক্তিযুদ্ধ পূর্বকালের কয়েকটি ভাস্কর্য যেমন মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা দিয়েছে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের স্বরণে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোও মুক্তিযুদ্ধের প্রতিনিধিত্ব করে। মুক্তিযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের স্মৃতিকে লালন করার জন্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে স্বাধীনতার চেতনাকে প্রবাহিত করতেই মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক ভাস্কর্যগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এরূপ স্মৃতিময় ভাস্কর্য রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এমনকি বাংলাদেশের বাইরে বিভিন্ন দেশেও বাঙালি অধ্যুষিত অঞ্চলে এরূপ ভাস্কর্য রয়েছে।

পটভূমি: মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিমূল রচিত হয়েছিল ৫২র ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে। ২১ ফেব্রুয়ারির সেই ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখতে তাৎক্ষণিকভাবে একটি শহিদ মিনার নির্মাণ করা হয়েছিল। এটি ছিল বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের স্বরণে নির্মিত প্রথম ভাস্কর্য। কিন্তু পাকিস্থান সরকার এটিকে গুড়িয়ে দেয়। পরবর্তীকালে এই শহিদ মিনার স্থায়ী রূপে নির্মাণ করা হলেও বিভিন্ন সময়ে তা হানাদার বাহিনীর আক্রোশের শিকার হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালো রাতে হানাদার বাহিনী এই শহিদ মিনারকে ভেঙ্গে ফেলে। এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধকে প্রভাবিত করেবাঙালি তরুণ যুব সম্প্রদায়ের হৃদয়ে এই ঘটনা চরম আঘাত হানে। মুক্তিযুদ্ধ বেগবান হওয়ার পেছনে যেসব ঘটনা প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছিল শহিদ মিনার ভাঙ্গা তার মধ্যে অন্যতম বলে মনে করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখার প্রয়াস: বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধরে রাখা এবং এর বার্তা পরবর্তী প্রজন্মের নিকট পৌঁছে দেয়া হলো ভাস্কর্য নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য। এ ছাড়া এটি সৌন্দর্য বর্ধনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা পালন করে থাকে। বিভিন্ন সড়কদ্বীপ, শহরের প্রবেশপথ, শিক্ষাঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ স্থান, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান, ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থানে সাধারণত এরূপ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়ে থাকে। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন ধাপ ও পর্যায় তুলে ধরা হয়েছে এসব ভাস্কর্যে। তাই এসব ভাস্কর্য যেন মুক্তিসংগ্রামের জীবন্ত ইতিহাস। ইতিহাসের বাস্তব পাঠশালা হয়ে এসব ভাস্কর্য সবাইকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে দিনের পর দিন। মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বীর বাঙালি মুক্তিসেনার অবদানকে জাতির নিকট উপস্থাপন করার সবচেয়ে কার্যকরী ও ফলপ্রসূ মাধ্যম হলো এই ভাস্কর্যগুলো।

প্রধান কয়েকটি ভাস্কর্য: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের আনাচে কানাচে অসংখ্য ভাস্কর্য তৈরি করা হয়েছে। এর সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। তন্মধ্যে প্রধান কয়েকটি ভাস্কর্যের বর্ণনা নিম্নে দেওয়া হলো-

জাগ্রত চৌরঙ্গী: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে জয়দেবপুর সেনানিবাসের বাঙালি সেনারা। এর স্মরণে দেশের প্রথম ভাস্কর্যটি নির্মিাণ করা হয় ১৯৭৩ সালে জয়দেবপুর চৌরাস্তায়। জাগ্রত চৌরঙ্গী নামক এই ভাস্কর্যটির শিল্পী আবদুর রাজ্জাক।

অপরাজেয় বাংলা: এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে অবস্থিতএর নির্মাতা ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালেদ। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলার নারী-পুরুষের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ ও বিজয়ের প্রতীক এই ভাস্কর্য। ১৯৭৩ সালে শুরু হয়ে ১৯৭৯ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। মূল ভাস্কর্যটির উচ্চতা ১২ ফুট।

সাবাশ বাংলাদেশ: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবস্থিত বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম ভাস্কর্য এটি। এর শিল্পী নিতুন কুন্ডু। ১৯৯২ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়

বিজয় কেতন: ঢাকা সেনানিবাসের মূল ফটকে অবস্থিত এই ভাস্কর্যটি। ৭ জন মুক্তিযোদ্ধার স্বারক এটি, যার একজন নারী হলো পতাকাবাহী।

স্বোপার্জিত স্বাধীনতা: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি সড়কদ্বীপে অবস্থিত। এটি বিজয়ের প্রতীক। ১৯৮৮ সালে উদ্বোধিত এই ভাস্কর্যের নির্মাতা শামীম শিকদার।

স্বাধীনতা সংগ্রাম: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত সর্ববৃহৎ ভাস্কর্য এটি। এই ভাস্কর্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডে অবস্থিত। বাঙালির ইতিহাসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত সমস্ত বীরত্বকে ধারণ করে তৈরি করা হয়েছে এ ভাস্কর্যটি। ১৯৯৯ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়।

মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ: ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের মুজিবনগরে প্রবাসী সরকার শপথ গ্রহণ করে। এই ঘটনাকে স্বরণীয় করে রাখতে ১৯৮৭ সালে এখানে উদ্বোধন করা হয় মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ।

জাতীয় স্মৃতিসৌধ: ঢাকার অদূরে সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ। এর স্থপতি মইনুল হোসেন। ১৯৭৯ সালে এটি উদ্বোধন করা হয়। এটি সম্মিলিত প্রয়াস নামে পরিচিত।

রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ: ১৯৭১ সালে রায়েরবাজারের এই এলাকায় ইটের ভাটা ছিল। ডিএনডি বাধের এ অংশে অনেক বুদ্ধিজীবীকে ধরে এনে হত্যা করা হয়। এই নিষ্ঠুর হত্যাকান্ডের স্মরণে নির্মিত সৌধ।

শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ: এটি ঢাকার মীরপুরে অবস্থিত। ১৯৭৯ সালের ১৪ ডিসে¤¦র দেশের সূর্যসন্তানদেরকে এখানে এনে হত্যা করা হয়। তাঁদের স্বরণেই এই ভাস্কর্যটি তৈরি করা হয়।

শিখা অনির্বাণ: শিখা অনির্বাণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। যুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী সৈনিকদের স্মরণে ঢাকা সেনানিবাসে এটি তৈরি করা হয়েছে।

অন্যান্য: এছাড়াও দেশে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক আরও যেসব ভাস্কর্য রয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- বীরের প্রত্যাবর্তন (বাড্ডা, ঢাকা), প্রত্যাশা (ফুলবাড়ীয়া, ঢাকা), স্বাধীনতা (ঢাকা), সংশপ্তক (জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়), মুক্তবাংলা (ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়), স্মারক ভাস্কর্য (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়), বিজয় ৭১ (বাকৃবি), চেতনা ৭১ (পুলিশ লাইন, কুষ্টিয়া), দূর্জয় (ঢাকা), রক্তসোপান (রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস, গাজীপুর), অঙ্গীকার (চাঁদপুর) ইত্যাদি।

গুরুত্ব: যতদিন বাংলাদেশ থাকবে ততদিন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স্বরণীয় হয়ে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের বিভিন্ন উপায় রয়েছে। জাদুঘর ও বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত ইতিহাসের ন্যায় ভাস্কর্যগুলোও এক একটি ইতিহাস। তাই বাংলাদেশের জাতীয় প্রেক্ষাপটে এই ভাস্কর্যগুলোর গুরুত্ব অনস্বীকার্য।

সমালোচনা: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণের নামে যে ভাস্কর্যগুলো করা হয়েছে, এর বিরুদ্ধে সমালোচনাও কম নয়। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষের ধর্ম ইসলাম। এরূপ ভাস্কর্য নির্মাণ ইসলামের মৌলিক নীতি সমর্থিত নয় বলে এক শেণির মানুষ মনে করেন। এছাড়াও একটি ভাস্কর্য নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তাও কম নয়। এটিকে অনেকে অপচয় হিসেবে দেখে থাকেন। অনেক সময় এসব ভাস্কর্য যেরূপ অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থাকে, দেখলে মনে হয় এর মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদেরকে সম্মান করার চেয়ে যেন অবমাননাই বেশি করা হয়।

উপসংহার: জাতীয় আশা আকাঙ্ক্ষা এবং ইতিহাস ঐতিহ্য প্রকাশ পায় শিল্পকলার মাধ্যমে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সংগ্রাম, ও চেতনা প্রকাশের একটি মাধ্যম হলো এদেশের মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ভাস্কর্যসমূহ। এসব ভাস্কর্য মহান মুক্তিসংগ্রামের ত্যাগ-তিতিক্ষা ও আত্মদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাঙালিদেরকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়।


জ্বালানি সংকট ও বিকল্প শক্তি

জ্বালানি সংকট ও বিকল্প শক্তি

ভূমিকা: বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এ দেশের মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো প্রতিনিয়ত হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। তাই প্রয়োজন অনুসারে মানুষ তাদের চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারছে না। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী যোগানের ঘাটতি এখন জ্বালানি ক্ষেত্রেও পরিলক্ষিত হচ্ছে। জ্বালানি শক্তির উপরই নির্ভর করে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব, কিন্তু আমাদের দেশের জ্বালানি শক্তির সংকট প্রকট আকার ধারন করেছে। তাই এই জ্বালানি সংকটের সমাধানের জন্য বিকল্প শক্তির প্রসার ঘটানো প্রয়োজন।

বাংলাদেশে জ্বালানি শক্তির উৎস: বাংলাদেশ জ্বালানি শক্তিতে তেমন সমৃদ্ধ নয়। এ দেশে জ্বালানির অবাণিজ্যিক উৎস সমূহ হলো- জৈব জ্বালানি, কৃষির অবশিষ্টাংশ, বৃক্ষের কাঠ এবং প্রাণীর মলমূত্র ইত্যাদি। আবার জ্বালানির বানিজ্যিক উৎস সমূহ হলো- জীবাশ্ম জ্বালানি তথা কয়লা, তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং পানি শক্তি ইত্যাদি।

জ্বালানি সংকটের কারণ: বাংলাদেশের জ্বালানির অন্যতম উৎস হলো কয়লা, গ্যাস এবং তেল। শিল্প, পরিবহন, রান্না এবং জমিতে সেচের কাজে প্রচুর গ্যাস, কয়লা এবং তেল ব্যবহার করা হয়। নিম্নে প্রাকৃতিক গ্যাস, কয়লা, খনিজ তেল এবং পানি শক্তির সংকটের কারণ সর্ম্পকে আলোচনা করা হলো-

প্রাকৃতিক গ্যাস সংকটের কারণ: বাংলাদেশের অন্যতম জ্বালানি সম্পদ হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। এটি মোট বাণিজ্যিক জ্বালানি ব্যবহারের ৭৫ ভাগ পূরণ করে। এদেশে গ্যাস ক্ষেত্রের সংখ্যা ২৫ টি। কিন্তু ১৯টি গ্যাস ক্ষেত্রের ৮৩টি কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন হচ্ছে। বাংলাদেশ যে সব আন্তর্জাতিক কোম্পানির সাথে গ্যাস উত্তোলন এবং আবিষ্কারের জন্য চুক্তি করেছে তাদের অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। নাইকো নামে কানাডার অখ্যাত কোম্পানির কাছে টেংরাটিলাসহ সিলেটের বিরাট সম্ভাবনাময় এলাকা ইজারা দেওয়া হয়। কোম্পানীটি গ্যাস ক্ষেত্রের মরাত্মক ক্ষতি করেছে। আমেরিকার অক্সিডেন্টাল কোম্পানি মৌলভীবাজারের মাগুড়ছড়ায় কূপ খনন কাজ শুরু করলেও ১২ দিনের মাথায় অগ্নিকান্ডের মতো বিপর্যয় ঘটে। এ আগুন দীর্ঘ ৬ মাস যাবৎ চলতে থাকে। এতে দেশের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় সাড়ে ২৮ কোটি মার্কিন ডলার। এভাবে আমাদের দেশের প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট তৈরি হচ্ছে।

কয়লা সংকটের কারণ: দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে রংপুরের খালাশপীর, দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ি দীঘিপাড়া এবং বগুড়ার জামালগঞ্জসহ মোট ৫টি কয়লা ক্ষেত্র আছে। আমাদের দেশে বিপুল পরিমানে উন্নত মানের কয়লা আছে। কিন্তু আমাদের দেশের প্রকৌশলী এবং টেকনোশিয়ানরা যথেষ্ট অভিজ্ঞ নয়। সঠিক উপায়ে উত্তোলন করতে না পারার কারণে কয়লা সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

খনিজ তেলের সংকট: ১৯৮৬ সালে সিলেটে হরিপুরের গ্যাস ক্ষেত্রের ৭ম কূপ থেকে অপ্রত্যাশিতভাবে তেলের সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৮৭ সালের জানুয়ারি মাসে বাংলাদেশ তেল উৎপাদন শুরু হলে ১৯৯৪ সাল থেকে এর তেল উৎপাদন স্থগিত করা হয়। দেশে খনিজ তেলের যে চাহিদা সেই অনুযায়ী খনি নেই। বর্তমানে বাংলাদেশে তেলের চাহিদা ৪৫০০০ ব্যারেল। যার পুরোটাই বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। এ দেশে তেলের খনি সন্ধানে পরিকল্পনার অভাব এবং উন্নত প্রযুক্তির অভাবের কারণে মানুষের চাহিদার তুলনায় তেলের সংকট বেড়েই চলেছে।

বিকল্প শক্তির উৎস: জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতা থেকে মুক্তির জন্য সারা বিশ্বের মানুষ আজ বিকল্প শক্তির উৎস খুঁজে চলেছে। এ সংকট সমাধানের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিজ্ঞানীরা আন্তর্জাতিক শক্তি সম্মেলনে মিলিত হচ্ছে। তারা পারস্পরিক সহযোগিতার উপর গুরুত্ব দিয়ে চৌদ্দটি বিকল্প উৎসের কথা বলেছেন। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো সৌর শক্তি, সমুদ্রের বায়ু শক্তি, পরমাণু শক্তি, জোয়ার ভাটা থেকে প্রাপ্ত শক্তি, ভূ-তাপীয় শক্তি, সাগরের তাপীয় শক্তি এবং বায়ো গ্যাস ইত্যাদি।

জৈব গ্যাস: জৈব গ্যাস হলো বাতাসের অনুপস্থিতিতে জৈব বস্তুর অনুজীবীয় ভাঙ্গনের ফলে সৃষ্ট গ্যাস। এই গ্যাস মূলত মিথেন এবং কার্বন-ডাই অক্সাইডের সমন্বয়ে গঠিত। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ বা সায়েন্স ল্যাবরেটরির যৌথ উদ্যোগে সত্তর দশকের প্রথম দিকে জৈব গ্যাস উৎপাদনের যন্ত্র নির্মাণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৬ সালে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে ৩ ঘনফুট উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন জৈব গ্যাস উৎপাদক যন্ত্র স্থাপন করা হয়। ১৯৯৬ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে গবাদি পশুর মোট সংখ্যা ২,৪১,৯০,০০০ যা থেকে প্রতিদিন ২৪,২০,০০০০০ কিলোগ্রাম বর্জ্য উৎপন্ন হয়এই পরিমাণ পশু বর্জ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ,১৯,১০৯ ঘনমিটার জৈব গ্যাস উৎপাদন করা সম্ভব। ২০০৪-০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে গবাদি পশুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। এটি ১৯৯৬ সালের তুলনায় দ্বিগুণ। এই পশু র্বজ্য থেকে আরো বেশি জৈব গ্যাস তৈরি সম্ভব। ৫-৬টি গবাদি পশু যে পরিবারে আছে সে পরিবারের দৈনন্দিন জ্বালানি চাহিদা মেটাতে সাধারণ আকৃতির জৈব গ্যাস উৎপাদন যন্ত্রই যথেষ্ট। জৈব গ্যাস জ্বালানি গ্যাস এবং কেরোসিনের উপর চাপ কমায়।

সৌর শক্তি: সৌর শক্তি বিকল্প জ্বালানির অন্যতম উৎস। মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এ দেশে জুনের মাঝামাঝি সময় থেকে সেপ্টেম্বর এর মাঝা-মাঝি সময় পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়। বছরের বাকী সময় আকাশ মেঘমুক্ত এবং রৌদ্রোজ্জ্বল থাকে। সুতরাং সূর্যরশ্মি জ্বালানির অভাব মেটাতে বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সূর্যের তাপ শক্তি তড়িৎ শক্তিতে রূপান্তরিত করে ব্যবহার উপযোগী করা যেতে পারে। বর্তমান সময়ে বিশেষ করে গ্রাম অঞ্চলে সৌর শক্তির ব্যাপক ব্যবহার দেখা যাচ্ছে।

বায়ু শক্তি: পৃথিবীর যে সকল দেশে সারা বছর একই দিক থেকে বায়ু প্রবাহিত হয় তারা বায়ু প্রবাহ বিকল্প শক্তি হিসেবে ব্যবহার করে বৃহত্তর কাজে লাগাতে পারে। বর্তমানে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বায়ু শক্তি ব্যবহার করে প্রচুর পরিমাণে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে।

পরমাণু শক্তি: জ্বালানি আজ বিশ্বের অন্যতম একটি সমস্যা। আর এ সমস্যা সমাধানের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিকল্প শক্তি হিসেবে পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। বর্তমান বিশ্বে ৪২০টি পরমাণু ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে। এদের মধ্যে ফ্রান্সে ৫৯টি এবং বেলজিয়ামে ৫৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র রয়েছে। ফ্রান্স ৭৯ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় পরমাণু কেন্দ্র থেকে। চীন এ খাত থেকে উৎপাদন করছে ৯ হাজার মেগাওয়াট, ভারত ৪ হাজার ১২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ২০২০ সালের মধ্যে পাকিস্তান ৭ হাজার, ভারত ২০ হাজার এবং চীন ৪০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করবে। ২০০৭ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশকে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়। এ লক্ষ্যে ২০০৯ সালের ১৩ মে বাংলাদেশ রাশিয়ার সাথে একটি চুক্তিতে সাক্ষর করে। এরপর ২০০৯ সালের ২১ মে মস্কোয় বাংলাদেশ ও রাশিয়া পরমাণু জ্বালানির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সহযোগিতায় কাঠামো চুক্তিস্বাক্ষর করে। বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার জন্য পরমাণু ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন করা খুবই জরুরি।

অন্যান্য শক্তি: অন্যান্য শক্তিগুলো হলো জোয়ার ভাটা থেকে প্রাপ্ত শক্তি, সাগরের তাপীয় শক্তি, তরঙ্গ শক্তি প্রভৃতি। এই বিকল্প শক্তি গুলো জ্বালানির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

উপসংহার: বাংলাদেশের ভূ-গর্ভে যথেষ্ট খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা থাকার কথা বলা হলেও নানা জটিলতার কারণে তা আবিষ্কার করা যায়নি। ফলে ধীরে ধীরে এ দেশে জ্বালানি সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। আমাদেরকে তাই জ্বালানির বিকল্প শক্তির উৎসগুলো খুঁজতে হবে। দেশের জ্বালানি সংকট দূর করে বিকল্প শক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে আরো নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে