Search This Blog

Saturday, January 28, 2017

লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা

লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা


ভূমিকা: একটি জাতির প্রাণ বলা হয় সে দেশের জাতীয় সঙ্গীতকে, আর পতাকা হলো সে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। জাতীয় সঙ্গীতের চেয়ে মধুর সঙ্গীত একটি ভাষাভাষী মানুষের কাছে আর কিছুই হতে পারে না। জাতীয় চেতনার সমন্বয়ক এবং আত্মচেতনার প্রতীক হলো জাতীয় সঙ্গীত। স্বাধীনতা পরবর্তী এবং স্বাধীনতার সময় আমাদেরকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল আমাদের জাতীয় সঙ্গীত। এই সঙ্গীতকে ঘিরে বাঙালি জাতির আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই। আর তাই স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর স্বাধীনতা দিবসে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্বরেকর্ড করেছে বাংলাদেশের মানুষ। সম্মিলিত প্রচেষ্টার এই উদ্যোগ আমাদের প্রাণে সুর হয়ে বাজবে বহুকাল।

আয়োজনের উদ্যোগ: গিনেজ বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম লেখানোর প্রত্যয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই অনন্য আয়োজনের উদ্যোগ নেয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় আর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৪৪ বছর পেরিয়ে গেলেও জাতীয় সঙ্গীতকে ঘিরে এমন বর্ণাঢ্য আয়োজন ছিল এই প্রথম। আর তাই বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজন করা হয় লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার এই মহতী কর্ম। এটি জাতিকে বিশ্ব দরবারে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়।

প্রস্তুতি পর্ব: একমাস ধরে সারা দেশে লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলাকর্মসূচি নিয়ে কর্মতৎপরতা চলে। শুদ্ধ করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্য, সঠিক সুরে গাওয়া জাতীয় সংগীতের অডিও রেকর্ড শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থাপনায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়। সেই অডিও থেকে সঠিক সুরে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার প্রশিক্ষণ ও মহড়া হয়েছে সারা দেশে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের সহায়তায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই আয়োজনটি বাস্তবায়ন করেছে। শুধু প্যারেড গ্রাউন্ড নয়, একই সময়ে সারাদেশের কোটি কোটি মানুষও কণ্ঠ মিলিয়ে গেয়েছেন আমার সোনার বাংলা গানটি। দেশের বাইরে অবস্থান করা বাংলাদেশিরাও এসময় গলা মিলিয়েছেন টেলিভিশন, ইন্টারনেটের কল্যাণে। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের ৪৩তম বার্ষিকীতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে রচিত হলো এই নতুন ইতিহাস ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮১ জন নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরী, তাদের মাঝে উপস্থিত দেশের প্রধানমন্ত্রী, সবার কণ্ঠেই এক সুর-আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি।

প্যারেড গ্রাউন্ডে যাত্রা:সকাল ছয়টা থেকে প্যারেড গ্রাউন্ডে প্রবেশ করতে শুরু করে মানুষ। দীর্ঘ লাইন ধরে প্যারেড গ্রাউন্ডের ভেতরে প্রবেশ করেন নানা শ্রেণি-পেশার লাখো মানুষ। অনেকেই মাঠে আসেন গায়ে পতাকা জড়িয়ে, মাথায় পতাকা বেঁধে। আয়োজনটিতে মেশিনে গণনা অনুযায়ী মানুষের অংশগ্রহণের সংখ্যা ছিলো ২,৫৪,৬৮১ জন। আয়োজকদের পক্ষ হতে জানানো হয়েছে যে রেকর্ড গড়ার জন্য গিনেস কর্তৃপক্ষের প্রদত্ত সকল শর্ত সূচারুরূপে পালিত হয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক গণনার বাইরেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলো ৩,২৫,০০০ এর অধিক মানুষ। অনুষ্ঠানস্থলে যোগ দিতে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সমবেত হয় প্যারেড গ্রাউন্ড চত্বরে। সকালের আকাশে সূর্য কিরণ ফুটে উঠার আগেই নানা শ্রেণি পেশার মানুষ প্যারেড গ্রাউন্ড অভিমুখে যাত্রা করে। এর ভিতরে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গার্মেন্টস কর্মী এবং সাধারণ মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। মানিক মিয়া এ্যাভিনিউ থেকে সামরিক বাহিনীর একজন সদস্যের নেতৃত্ব ১৫০ জন মানুষের একটি করে টিম সুশৃঙ্খলভাবে প্যারেড গ্রাউন্ড অভিমুখে যাত্রা করে। অনুষ্ঠানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার এই আয়োজনকে শতভাগ সফল করেছে। বয়সের বাধা উপেক্ষা করে ইতিহাসের অংশ হতে হাজির হয়েছিলেন বহু মুক্তিযোদ্ধা, যোদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বর্ষীয়ান অনেক মানুষ।

যেমন ছিল প্যারেড গ্রাউন্ড: প্যারেড গ্রাউন্ডের নির্ধারিত স্থানটি ১৫টি সেক্টরে ভাগ করা হয়। সেক্টরগুলো বিভক্ত ছিল অনেকগুলো ব্লকে। অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে একটি করে ক্যাপ ও ব্যাগ দেয়া হয়। ব্যাগে ছিল জাতীয় পতাকা, জাতীয় সঙ্গীত ও নিয়মাবলী লেখা সংবলিত একটি কার্ড, পানি, জুস, শুকনো খাবার ও স্যালাইনসহ তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ওষুধপ্রতিটি সেক্টরে একটি করে বড় স্ক্রিনে কিছুক্ষণ পরপরই জানিয়ে দেয়া হচ্ছিল মাঠের পরিস্থিতি আর উপস্থিতি। মঞ্চে ছিল শিল্পীদের নানা আয়োজন। মঞ্চের ঘোষণা অনুযায়ী সবাই গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলাচ্ছেন কি-না এবং রেকর্ডের জন্যে অন্যান্য নিয়মাবলী ঠিকমতো পালিত হচ্ছে কি-না তা দেখতে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডস রেকর্ডের প্রতিনিধিরা এ অনুষ্ঠান পর্যবেক্ষণ করেছেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় সঙ্গীত পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সুরকার স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের শব্দসৈনিক সুজেয় শ্যাম।বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করেছে।

উপস্থিতি ও প্রস্তুতি পর্ব: মূল পর্বের আগে সকাল ৮টা থেকে শিল্পকলা একাডেমির পরিবেশনায় দেশবরেণ্য এবং খ্যাতনামা শিল্পীদের অংশগ্রহণে মাঠে শুরু হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। চূড়ান্ত জাতীয় সংগীত পরিবেশনের আগে পৌনে ১১টায় হয় দুই দফা অনুশীলন হয় যাতে প্রধানমন্ত্রীও অংশ নেন। এ সময় আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানসহ সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা।

লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা: বেলা ১১ টা ২০ মিনিটে এলো সেই মহেন্দ্রক্ষণ। মাইকে ঘোষণা এলো এখনই শুরু হবে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়ার কার্যক্রম। সম্মিলিত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনাকালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ হতে অংশগ্রহণ করেন ফাহিম হোসেন চৌধুরী, মীতা হক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, রাইসা আহমেদ লিসা, তপন মাহমুদ, সাজেদ আকবর, সালমা আকবর, লিলি ইসলাম, ফাতেমাতুজ জোহরা, ইন্দ্রমোহন রাজবংশী, তিমির নন্দী, বুলবুল মহলানবীশ, আব্দুল জব্বার, মহিউদ্দীন চৌধুরী, ইয়াকুব আলী খান, খায়রুল আনাম শাকিল, শাহীন সামাদ, সুজিত মোস্তফা, সুমন চৌধুরী, ফরিদা পারভীন, চন্দনা মজুমদার এবং ফকির আলমগীরের মতো দেশ বরেণ্য শিল্পীরা। ঘড়ির কাটায় সকাল ১১টা ২০ মিনিটে রাজধানীর তেজগাঁও জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হয়- আমার সোনার বাংলা’, আমি তোমায় ভালোবাসি’...বাংলাদেশ আর বাংলাদেশিদের প্রাণের এ সুর ছড়িয়ে পড়ে প্যারেড গ্রাউন্ডের বাইরে, সারা বাংলাদেশে। পুরো পৃথিবীজুড়ে যেখানে যতো বাংলাদেশি রয়েছেন তারাও কণ্ঠ মেলালেন লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া জাতীয় সংগীতে।

গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডস রেকর্ডের স্বীকৃতি: ৯ এপ্রিল, ২০১৪ সর্বাধিক মানুষের অংশগ্রহণে জাতীয় সংগীত গাওয়ার বিশ্ব রেকর্ড গড়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ৯ এপ্রিল, ২০১৪ GUINNESS WORLD RECORDS কর্তৃপক্ষ এই স্বীকৃতি প্রদান করেআনুষ্ঠানিকভাবে দেয়া ঘোষণা অনুযায়ী ২ লাখ ৫৪ হাজার ৬৮১ জন সম্মিলিত কণ্ঠে মূল অনুষ্ঠান স্থলে সমবেত কণ্ঠে গানটি গেয়েছেন। লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার মাধ্যমে ৪৪তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে বাংলাদেশ উঠে গেল নতুন এক মর্যাদার উচ্চ শিখরে। পাশাপাশি লাখো কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়ার বিশ্ব রেকর্ড তৈরি করে বাংলাদেশের নাম উঠল গিনেজ রেকর্ডে। যা বাঙালি জাতিকে নতুন করে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রেরণা জোগাবে যুগ যুগ ধরে।

উপসংহার: দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ বাঙালি জাতি নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ছিনিয়ে এনেছে স্বাধীনতার সোনালি সূর্য, বিজয়ের লাল সবুজ পতাকা। মুক্তিযোদ্ধারা বুকের পাজরে বুলেটের তাজা ক্ষত নিয়েও অম্লান রেখেছে দেশমাতৃকার সম্মান। ৪৪তম স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে সেইসব বীর সেনানীদের শ্রদ্ধা জানাতে, দেশের মানুষকে নতুন করে দেশপ্রেম ও জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে ২৬ মার্চ, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের প্রায় তিন লাখ মানুষ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সমবেত হয়ে একযোগে জাতীয় সংগীত গেয়েছে। যা পরবর্তীতে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডস রেকর্ডে স্থান করে নেয়।

No comments:

Post a Comment