Search This Blog

Friday, February 10, 2017

হরতাল ও ধর্মঘট

হরতাল ও ধর্মঘট
ভূমিকাঃ বাংলাদেশের আলোচ্য বিষয় সমূহের মধ্যে হরতাল ও ধর্মঘট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতীত থেকে আজ পর্যন্ত হরতাল ও ধর্মঘট মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনেতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কৌশল হিসেবেই স্বীকৃতি পেয়ে আসছে। তবে বর্তমান সময়ে হরতাল ও ধর্মঘটের নেতিবাচক প্রভাব দেশ ও মানুষের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারপরও হরতাল বা ধর্মঘটের মাধ্যমেই মূলত বড় ধরণের আন্দোলনের দাবি আদায় ও অধিকার অর্জন সম্ভব হয়।
হরতাল ও ধর্মঘটঃ ‘হারতালশব্দটি গুজরাটি ভাষা থেকে এসেছে যা বিশ্লেষণ করলে অর্থ দাঁড়ায় হর-(প্রত্যেক)+তাল-(তালা)অর্থাৎ প্রতি দরজায় তালা। বিক্ষোভ প্রকাশের জন্য যানবাহন, হাটবাজার, দোকানপাট, অফিস-আদালত প্রভৃতি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ করার নাম হরতাল। আবার ইংরেজি Strike শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ ধর্মঘট। এর অর্থ আঘাত করা। কোনো অন্যায় বা অসঙ্গতির প্রতিবাদে কর্মবিরতির মাধ্যমে বিক্ষোভ প্রকাশ করে ধর্মঘট পালন করা হয়। তবে ধর্মঘটের তুলনায় হরতালের ব্যাপকতা আরো বেশি। ধর্মঘট সাধারণত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক দাবিতে পালিত হয়। তবে প্রতিষ্ঠানের গন্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর স্বার্থেও ধর্মঘট আহ্বান করা হয়ে থাকে। আর হরতাল দাবি আদায়ের জন্য সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উপর সার্বিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে জনগণের সমর্থন আদায়ের মাধ্যমে আঞ্চলিক বা সমগ্র দেশজুড়ে দোকানপাট, যানবাহন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কল-কারখানা, অফিস-আদালত ইত্যাদি সব ধরণের প্রতিষ্ঠানে কর্মবিরতির ডাক এবং বিক্ষোভ প্রদর্শনের কর্মসূচী।
হরতাল বা ধর্মঘটের ইতিহাসঃ হরতাল বা ধর্মঘটের সুনির্দিষ্ট কোনো ইতিহাস পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয় ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার গৃহ নির্মাণ শ্রমিকরা কর্মঘণ্টা কমিয়ে দশ ঘন্টা করার দাবিতে প্রথম ধর্মঘট করে। এছাড়া ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের ১ মে শ্রমিকরা কাজের সময় আট ঘন্টা করার দাবিতে যে হরতাল পালন করেছিল তা আজও সারাবিশ্বে মহান মে দিবস হিসেবে স্বীকৃত।
হরতাল ও ধর্মঘটের তাৎপর্যঃ পুঁজিবাদী সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থা মুনাফা ভিত্তিক। উৎপাদন ব্যবস্থার মালিক শ্রেণি মুনাফার স্বার্থে শ্রমিকদেরকে শোষণ করে থাকে। শ্রমিকরা উদয়াস্ত শ্রম দেয়, উৎপাদন বাড়ায় অথচ তাদের ন্যায্য মজুরি পায় না। ছাটাইয়ের ফলে কর্মের নিশ্চয়তাও থাকে না। এই অন্যায় ও শোষণমূলক ব্যবস্থায় শ্রমিকদের মাঝে যখন চরম অসন্তোষ বিরাজ করে, তখন আহ্বান করা হয় ধর্মঘট। এখন ধর্মঘট শুধু শ্রমিকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। কলকারখানা ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। বর্তমানে ছাত্র ধর্মঘট, পরিবহন ধর্মঘট, ডাক্তার-শিক্ষক-আইনজীবী তথা সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির দাবিতে বা কোনো অন্যায়ের বিচারের দাবিতে ধর্মঘট পালন করা হয়। হরতাল বা ধর্মঘট মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার। তাই অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে হরতাল বা ধর্মঘট গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য বহন করে।
বাংলাদেশে হরতাল বা ধর্মঘটঃ বাংলাদেশের রাজনীতিতে হরতাল বা ধর্মঘট অন্যতম প্রধান বিবেচ্য বিষয়। হরতালের সূচনা শ্রমিকদের মাধ্যমে হলেও তা এখন সর্বজনের আন্দোলনের হাতিয়ার। রাজনৈতিক দলগুলো সরকারের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপন করে হরতাল পালন করে থাকে। বাংলাদেশের অতীত ইতিহাসে হরতাল বা ধর্মঘট গৌরবোজ্জ্বল স্থান দখল করে আছে। ১৯৫২ সালের রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ছয়দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের স্বৈরাচার বিরোধী গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা পরবর্তী আন্দোলনগুলোতে হরতাল ও ধর্মঘটের কার্যকরী ভূমিকা ছিল। তবে বর্তমানে বাংলাদেশে হরতাল ও ধর্মঘট বিভিন্ন দলের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অস্ত্র। লাগাতার হরতাল বা ধর্মঘটের মাধ্যমে জনগণের জীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়ে থাকে। কেননা, জনগণের স্বার্থের কথা না ভেবে যখন দলীয় স্বার্থ হাসিলের জন্য হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান করা হয় তখন তা দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অসহিষ্ণুতার অপসংস্কৃতিই বাংলাদেশের রাজনীতিতে হরতাল বা ধর্মঘটের অপব্যবহারের মূল। তাই সত্যিকারভাবে হরতাল বা ধর্মঘটের মূলমর্ম রক্ষায় দেশের সকলের সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
হরতালে জনসমর্থনঃ হরতাল বা ধর্মঘটে জনসমর্থন অত্যন্ত জরুরি। হরতাল বা ধর্মঘটের দাবিগুলোর প্রতি জনগণের সমর্থন থাকলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। কিন্তু জনসমর্থনহীন হরতাল বা ধর্মঘট প্রশ্নবিদ্ধ হয় এবং অকল্যাণ বয়ে আনে। অতীতের সকল সফল আন্দোলনের হরতাল বা ধর্মঘটে সাধারণ মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল। কিন্তু বর্তমানে স্বার্থান্ধ রাজনীতির কারণে বাংলাদেশে একের পর এক জনসমর্থনহীন হরতাল বা ধর্মঘট মানুষের স্বাভাবিক জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই হরতাল বা ধর্মঘটে জনসমর্থনের বিষয়টা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
যেসব ইস্যুতে হরতাল বা ধর্মঘটঃ বাংলাদেশের বিভিন্ন ইস্যুতে হরতাল বা ধর্মঘট কর্মসূচী গ্রহণ করা হয়। মিছিল সমাবেশে বাঁধা, হত্যাকান্ড-, গুম-খুন-অপহরণ, দুর্নীতি ইত্যাদির প্রতিবাদে হরতাল ডাকা হয়। সরকারের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত বাতিল, মজুরি বৃদ্ধি, শিক্ষা-কৃষি-স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বৃদ্ধি, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার প্রভৃতির দাবিতে এমনকি স্বৈরাচারী সরকারের পতনের জন্যও হরতাল পালন করা হয়ে থাকে।
হরতাল বা ধর্মঘটের অর্জনের দিকঃ হরতাল বা ধর্মঘট আহ্বান করলে মানুষ তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে এবং ঐক্যবদ্ধ হয়। যদিও এর ক্ষতির দিক রয়েছে, তবুও হরতাল বা ধর্মঘটই কোনো একটি নৈতিক আন্দোলনকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়ার মোক্ষম অস্ত্র। প্রতিবাদের কঠিন ভাষা হিসেবে হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচীরও প্রয়োজন আছে। হরতাল বা ধর্মঘটের ফলে অর্জিত অধিকার পরবর্তীতে মানুষের কল্যাণ বয়ে আনে। তাই আজও আমরা অতীতের আন্দোলনের সুফল ভোগ করতে পারি।
হরতাল বা ধর্মঘটের ক্ষতিকর দিকঃ নৈতিক আন্দোলনের হাতিয়ার হওয়া সত্ত্বেও স্বার্থান্ধ রাজনীতির কারণে হরতাল বা ধর্মঘট সবসময় ভালো ফল বয়ে আনে না। বাংলাদেশে এখনকার হরতালগুলোতে নাশকতামূলক কর্মকা- ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। হরতালের আগের দিন বোমাবাজি যেন ধ্বংসযজ্ঞের পূর্বাভাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরতাল চলাকালে গাড়ি-দোকানপাট ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সাংবাদিক নিপীড়ন, গণগ্রেফতার, অসহায় মানুষের প্রাণহানি প্রভৃতি এদেশের ভবিষ্যৎ উন্নতির ক্ষেত্রে অন্তরায়। হরতালের কারণে হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটে, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়, খেটে খাওয়া দিনমজুরদের দুর্ভোগ বাড়ে, অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়, রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয় এবং অনীহা সৃষ্টি হয়। অবৈধ হরতাল বা ধর্মঘট মানুষকে বিতৃষ্ণ করে তোলে এবং এটা দেশের কল্যাণের পথে নতুন আশঙ্কার জন্ম দেয়।
উপসংহারঃ পরিবর্তনশীল বিশ্বে আন্দোলনের ধরণেরও পরিবর্তন হবে এটাই স্বাভাবিক। তবুও হরতাল বা ধর্মঘটের মূল মাহাত্ত্ব্য বিবেচনায় না রেখে যারা এর অপব্যবহার করেন, তাদেরকে এই কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, মানুষের কল্যাণের জন্যই রাজনীতি এবং রাজনৈতিক কর্মসূচী। শাসক শ্রেণিকেও জনগণের অধিকার সমুন্নত রাখায় সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তাহলেই কেবল সম্ভব হবে সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া। আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ পাবে সত্যিকারের স্বাধীনতার সুখ।



No comments:

Post a Comment