Friday, February 10, 2017

বাংলাদেশের অর্থকরী ফসল পাট

বাংলাদেশের অর্থকরী ফসল পাট
ভূমিকাঃ বাংলাদেশ কৃষি প্রধান দেশ। নানা রকম কৃষিজাত পণ্য এদেশে উৎপন্ন হয়। এর মধ্যে পাট অন্যতম। বাংলাদেশে উৎপাদিত পাট দেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীব্যাপি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথকে করেছে সুগম। তাই একে স্বর্ণসূত্রবা সোনালি আঁশ বলা হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মানের পাট উৎপন্ন হয় বাংলাদেশে। এদেশের পাটের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে বিশ্ববাজারে।
পাট উৎপাদন অঞ্চলঃ যেকোনো মাটি ও জলবায়ু পাট চাষের জন্য উপযুক্ত নয়। পাট উৎপাদনের জন্য প্রয়োজন উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু। সেই সাথে প্রয়োজন নিচু জমি। বাংলাদেশ মৌসুমি জলবায়ুর অন্তর্গত দেশ। পাট চাষের সব অনুকূল পরিবেশই এখানে বিদ্যমান। তাই এদেশে প্রচুর পরিমাণে পাট উৎপন্ন হয়। আর এদেশে উৎপন্ন পাট সবচেয়ে উৎকৃষ্ট। তবে সবচেয়ে ভালো মানের পাট পাওয়া যায় ঢাকা, ময়মনসিংহ জামালপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা প্রভৃতি জেলায়। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, মায়ানমার প্রভৃতি দেশেও পাট উৎপন্ন হয়।
পাটের ব্যবহারঃ পাট থেকে দড়ি, বস্তা, ব্যাগ, কার্পেট প্রভৃতি নানা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি তৈরি হয়। তাছাড়া উন্নতমানের পাট থেকে বস্ত্রও তৈরি করা হয় ইংল্যান্ড, জার্মানি প্রভৃতি দেশে। গৃহের সৌন্দর্য বর্ধনে বিভিন্ন ধরণের পাপোশ, শিকা, শো-পিস, ওয়ালমেট তৈরি করা হয় পাট থেকে। আবার বিভিন্ন সৌখিন পণ্য যেমন, পার্স, জুতা প্রভৃতিও বর্তমানে পাট থেকে উৎপন্ন করা হয়। পাট খড়ি ব্যবহৃত হয় জ্বালানি হিসাবে। গৃহ নির্মাণ সামগ্রী হিসাবেও পাট খড়ির চাহিদা রয়েছে।
বাংলাদেশে পাট শিল্প প্রতিষ্ঠার ইতিহাসঃ পাট শিল্প এদেশের অর্থনীতির সোনালি ঐতিহ্য। এক সময় পাটই ছিল বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ৯০ ভাগই আসতো পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকে। স্বাধীনতার পূর্বে বাংলা ছিল পাট উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। এদেশের পাটের উপর ভিত্তি করেই সে সময় ভারত ও যুক্তরাজ্যে পাট শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। যুক্তরাজ্যের ডান্ডিতে স্থাপিত পাটকলসমূহ পূর্ব বাংলার পাট দিয়েই চলতো। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর অনেক পাটকল এদেশে স্থাপন করা হয়। ১৯৫১ সালে প্রথম বাংলাদেশে পৃথিবীর বৃহত্তম পাট কল আদমজী পাটকলস্থাপিত হয়।
পাট শিল্পের বর্তমান অবস্থাঃ বর্তমানে বাংলাদেশে পাট কলের সংখ্যা ১৫৪টি। এর মধ্যে সরকারি পাটকল হচ্ছে ২৭টি এবং ১২৭টি হচ্ছে বেসরকারি মালিকানাধীন। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমাগত লোকসানের ফলে এখন প্রায় ১২টি বেসরকারি ও ৬টি সরকারি পাট কল বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল আদমজী পাট কলবন্ধ হয়েছে ২০০২ সালে। সরকারি বন্ধ হওয়া পাট কলের মধ্যে ১ আগস্ট ২০০৭ সালে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ৪টি পাট কল বন্ধ হয়ে গেছে। পাট কলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব কলের হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হচ্ছে। ফলে এসব মানুষগুলোর জীবনে নেমে আসছে চরম দুর্দশা। পাট চাষীরাও তাদের ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হারিয়ে ফেলছে পাট চাষের আগ্রহ। ফলে পাট থেকে সরকার যে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করত তার পরিমাণও কমে যাচ্ছে।
চলতি অর্থবছরগুলোতে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি এবং আয়: বাংলাদেশের পাট এক সময় ছিল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস। কিন্তু বর্তমানে নানা কারণে এই আয় অনেক কমে গেছে। বাংলাদেশ রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) হিসাব মতে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯৩ কোটি ৬৭ লাখ মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে এই খাতে পণ্য রফতানিতে আয় হয়েছে ৬৭ কোটি ৪৭ লাখ মার্কিন ডলার। ২০১২-১৩ অর্থবছরের একই সময়ে এই খাতে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৮৬ কোটি মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে কাঁচা পাট রপ্তানিতে আয় ছিল ২০ কোটি মার্কিন ডলার। চলতি অর্থবছরে একই সময়ে এই খাতে আয় হয়েছে ১০ কোটি মার্কিন ডলার। কাজেই দেখা যায় পাট শিল্প থেকে আয় ক্রমাগতই কম হচ্ছে।
বাংলাদেশের পাট শিল্পে বিদ্যমান সমস্যাঃ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এ শিল্পটি তার প্রাধান্য হারাচ্ছে বিশ্ববাজারে। বাংলাদেশের পাট শিল্প বিকাশে বিদ্যমান নানাবিদ সমস্যার চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো-
       - বাংলাদেশের পাট চাষীরা মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম, আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের নিম্নমূল্য প্রভৃতি কারণে তাদের পাটের নায্য দাম পায় না।
      - বাংলাদেশ ছাড়াও আরো অন্যান্য দেশে পাট উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের চাহিদা পূর্বের চেয়ে কম হচ্ছে। অন্যান্য দেশের সাথে প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে বাংলাদেশের পাট শিল্প।
      - আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পাটের মান কমে যাচ্ছে। এ ছাড়াও উন্নত বীজ ও উপকরণ সরবরাহের অভাব বিদ্যমান। উন্নত পচন পদ্ধতির প্রশিক্ষণও কৃষকদের নেই।
      - পলিথিন ও সিনথেটিকের উপর অধিক মাত্রায় নির্ভরশীলতার ফলে পাটজাত দ্রব্যের চাহিদা এবং উপযুক্ত মূল্য দুটোই হ্রাস পাচ্ছে। ফলে কমে যাচ্ছে পাটের উৎপাদন।
      - পাট থেকে নতুন পণ্য উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট গবেষণার ব্যবস্থা বাংলাদেশে নেই। তাছাড়া কারিগরি জ্ঞানের অভাবে এদেশে পাটের বহুমাত্রিক ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না।
     - বিশ্বের অন্যান্য পাট উৎপাদনকারী দেশগুলোতে পাট শিল্পে নানা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের পাটশিল্প এই প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। ফলে বিশ্বে পাটের চাহিদার যে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ তার সুযোগ নিতে পারছে না।
     - বাংলাদেশে পাট নীতির প্রণয়ন হলেও তা প্রয়োগযোগ্য নয়। যুগোপযোগী সুষ্ঠু পাট নীতির প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের অভাব রয়েছে।
বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে করণীয়ঃ বাংলাদেশের পাট শিল্পে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য প্রয়োজন নানা কার্যকরী পদক্ষেপ। নিচে এ বিষয়ে কিছু মতামত তুলে ধরা হলো-
     - পাট চাষীদের ন্যায্য দাম নির্ধারণের জন্য সরকারের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন। সেই সাথে বন্ধ করতে হবে মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ম।
     - আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের জন্য সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, প্রতিবেশী দেশের ষড়যন্ত্র বন্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে।
     - উৎপাদন ব্যয় কমানো, উন্নত বীজ ও উপকরণ সুলভ মূল্যে সরবরাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। তাছাড়া পাট থেকে নতুন নতুন সব পণ্য তৈরীর জন্য কারিগরী জ্ঞান ও গবেষণার ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন।
     - দেশের অভ্যন্তরে পাটজাত দ্রব্য ব্যবহারের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এজন্য দেশের অভ্যন্তরে পাট জাত দ্রব্যের বিকল্প দ্রব্য ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন।
     - পাট উৎপাদনে গতানুগতিক পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি বাদ দিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
     - পাট শিল্পের জন্য নীতির প্রণয়ন ও সেসব নীতির যথাযথ বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নিতে হবে।
     - বেসরকারি উদ্যোক্তাদের পাট শিল্প রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে। সেই সাথে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে পাট চাষ ও পাট থেকে উৎপাদিত দ্রব্যের ব্যবহার সম্বন্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করতে হবে।
     - পাট শিল্পকে বাঁচাতে দরকার পর্যাপ্ত অর্থের যোগান। তাই উদ্যোক্তাদের বকেয়া মওকুফ ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান এখন অনেক বেশি জরুরি। তাছাড়া পাটের উৎপাদন বাড়াতে কৃষকদের জন্য বিনা সুদে বা স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
     - দেশের উৎপাদিত পাটজাত পণ্যগুলোর প্রচারণা চালাতে বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় ব্যাপক অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
     - যেসব পাটজাত পণ্যের চাহিদা বাজারে বেশি সেসব পণ্য বাণিজ্যিক ভিত্তিতে উৎপাদন ও রপ্তানির ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশে পাটশিল্পের সম্ভাবনাঃ বাংলাদেশে উৎপাদিত পাট বিশ্বে সেরা। পাট শিল্পের বিকাশের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক চাহিদার সাথে মিল রেখে নতুন সব পাটজাত পণ্য উদ্ভাবন ও উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে। নিচে এসবের বর্ণনা দেয়া হলো-
     - পাটের কার্পেট তৈরির জন্য বাংলাদেশে বেশ কিছু কারখানা স্থাপন করা হয়েছে। পাটজাত কার্পেটের উৎপাদন ও গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য নানা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে।
     - পাট থেকে কাগজ তৈরির জন্য নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা কার্যকর হলে পাটশিল্পে বিদ্যমান লোকসান বহুগুণ কমার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
     - দেশের ফ্যাশন ডিজাইনারগণ পাটের তৈরি ব্যাগ, বস্তাসহ উৎপাদিত দ্রব্যের উপর সুন্দর ডিজাইন করে এগুলো ব্যবহারের প্রতি মানুষের আকর্ষণ তৈরি করছে।
     - পাটের সম্ভাবনার মূলে রয়েছে এর বহুমুখী রাসায়নিক গুণ। পাটের তৈরি জিনিস বারবার ব্যবহার করা যায়। যেমন-বস্তা, চট, কার্পেট, দড়ি, ব্যাগ ইত্যাদি।
     - পাটের কম্বল, পর্দার কাপড়, চিকন সুতা ইত্যাদি উদ্ভাবনের ফলে পাটের ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
পাটের জন্ম রহস্য উদ্ভাবন ও সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচনঃ উদ্ভিদের সকল বৈশিষ্ট্য যেমন বীজের গুণগত মান, পুষ্টি, আঁশ, উৎপাদন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সবকিছু জিনোমে লিপিবদ্ধ থাকে। এ তথ্যগুলো উদঘাটন করা গেলে সংশ্লিষ্ট উদ্ভিদের ফলনে উন্নয়ন ঘটানো সম্ভব। সম্প্রতি বাংলাদেশে পাটের জীবন রহস্য উন্মোচিত হয়েছে। পাটের জীবন রহস্য উন্মোচনকারী বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম বলেছেন, এই সাফল্য বাংলাদেশকে বিশ্ব পাট শিল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে যাবে। তার মতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত প্রজাতির পাট বীজ উদ্ভাবন করতে সক্ষম হবে। সরকারিভাবে বলা হয়েছে, পাট আঁশের দৈর্ঘ্য, রং ও বিশেষ গুণাবলী উন্নয়নের জন্য পাটের জিনোম সিকোয়েন্স বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট সুযোগ বয়ে আনবে। এর ফলে উচ্চ ফলনশীল, লবণ সহনশীল ও পোকা মাকড় প্রতিরোধক পাট চাষের প্রযুক্তি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। এতে বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার পুরাতন ঐতিহ্য।
উপসংহারঃ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে পাটশিল্প আশীর্বাদ স্বরূপ। কিন্তু নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ এই বিশাল সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেনা। তবে বর্তমানে নানা উদ্যোগ গ্রহণের ফলে পাট শিল্পে যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তা খুবই আশা ব্যঞ্জক। বিশ্ব বাজারের সাথে তাল মিলিয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে পাট শিল্পকে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের জীবনযাত্রার মান হবে উন্নত, আর এ শিল্প ফিরে পাবে তার হারানো ঐতিহ্য।

No comments:

Post a Comment