Search This Blog

Sunday, February 12, 2017

দেশভ্রমণ

দেশভ্রমণ
ভূমিকা: অজানাকে জানা এবং অদেখাকে দেখার যে আগ্রহ সেটি মানুষের রক্তের সাথে মিশে আছে। নতুন জিনিসের সাথে পরিচিত হওয়ার এ ইচ্ছা সৃষ্টির শুরু থেকে চলে আসছে। মানুষ গৃহকোণে আবদ্ধ হয়ে থাকতে চায় না। সীমাবদ্ধতার মাঝে বসবাস করার ফলে মানুষের মধ্যে ক্লান্তিবোধ নেমে আসে। আর এ জন্যই তারা বের হয়ে আসে ঘর থেকে, দেশ হতে দেশান্তরে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায় বলা যায়-
                                                          ‘থাকব নাক বদ্ধ ঘরে
                                                                   দেখব এবার জগৎটাকে।
দেশভ্রমনের সংজ্ঞা ও স্বরূপ: সাধারণত দেশভ্রমণ বলতে কোনো দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ানোকে বুঝায়। সংকীর্ণ অর্থে নিজের বাসস্থান ব্যতীত দেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণকে দেশভ্রমণ বলে। বৃহত্তর অর্থে নিজ দেশের বাইরে কোনো স্থান ভ্রমণকে বুঝায়। ভ্রমণ মানুষের মনে আনন্দ দেয়। এটি মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে। আর এ জন্যই আমরা দেখতে পাই যে, পৃথিবীর বিভিন্ন মনীষী জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি মনকে সজীব রাখার জন্য দেশভ্রমণ করেছেন।
দেশভ্রমণের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা: ভ্রমণের মধ্যে দিয়ে মানুষের জ্ঞান পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করে। যারা দেশভ্রমণ করে না তারা বাস্তব জগৎ থেকে শিক্ষা নিতে পারে না। ফলে তারা অনেক পিছিয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে শেক্সপিয়র বলেছেন- ‘Home keeping Youths ever having homely withs.’ অর্থাৎ ঘর কোণে যুবকের জ্ঞান বুদ্ধি বড়ই সীমিত। আবার টমাস হুড ভ্রমণের গুরুত্ব সম্পর্কে বলেন- যে যতো বেশি ভ্রমণ করবে তার জ্ঞান ততো বেশি বৃদ্ধি পাবে।গতিশীলতাই হলো জীবনের ধর্ম। ঘরের কোণে বসে থাকলে মানুষ কুসংস্কারে জড়িয়ে পড়ে এবং আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। তাই আমাদের অভিজ্ঞতার জগৎকে সমৃদ্ধ করতে হলে দেশভ্রমণ করতে হবে। আর এই ভ্রমণের মাধ্যমেই মনের জড়তা, একঘেয়েমি ভাব ও কুসংস্কার দূর করা সম্ভব।
দেশভ্রমণের উদ্দেশ্য: সাধারণত আমরা বই পড়ে যে জ্ঞান লাভ করি তার চেয়ে বেশি জানতে পারি দেশভ্রমণের মাধ্যমে। কারণ বই পড়ে আমরা পরোক্ষ জ্ঞান লাভ করি। আর ভ্রমণের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করি। কোনো বস্তু-স্থান এবং জাতি সম্পর্কে জানতে হলে ভ্রমণ করতে হবে। ভ্রমণের মাধ্যমে যেকোনো জিনিস আমাদের মনে স্থায়ীভাবে স্মৃতি আকারে জমা হয়ে থাকে। তাই আমাদের হৃদয় ও মনের প্রসার এবং চিন্তা-চেতনা বিকাশের জন্য দেশভ্রমণ অপরিহার্য।
শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে দেশভ্রমণ: শিক্ষার মাধ্যমে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়। আর এক্ষেত্রে দেশভ্রমণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। কেননা দেশভ্রমণের মাধ্যমেই কোনো শিক্ষার্থী সভ্যতা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করে থাকে এবং সত্যিকারের আলোকিত মানুষ হয়।
দেশভ্রমণ আনন্দের উৎস: দেশভ্রমণ শুধু জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জনের উৎসই নয় বরং এটি আনন্দেরও উৎস হিসেবে কাজ করে। গতানুগতিক ও একঘেয়েমি জীবনযাপন মানুষের ভালো লাগে না। মানুষ গতিশীলতা ও নতুনের স্বাদ নিতে চায়। আর এই নতুনের স্বাদ এবং আনন্দলাভ করতে হলে ভ্রমণ করা উচিত। দেশভ্রমণের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশ ও বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের সাথে আমাদের পরিচিতি বাড়ে। পৃথিবীর রূপ, রস, গন্ধ নিতে হলে এবং সবার সাথে পরিচিতি লাভ করতে হলে দেশভ্রমণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন-
                                                “ইচ্ছে করি মনে মনে
                                                            স্বজাতি হইয়া থাকি সর্বলোক সনে
                                                 দেশ-দেশান্তরে।
দেশভ্রমণের উপকারীতা: দেশভ্রমনের ফলে নানা শ্রেণি ও পেশার লোকের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। আবার বিভিন্ন দেশের মানুষের আচার-ব্যবহার, চাল-চলন, পোশাক-পরিচ্ছদ, রীতি-নীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, ভাষা, শিক্ষা, শিল্পকলা ও জীবনধারণের পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। তাই বলা যায় ভ্রমণের মাধ্যমে মানুষ আত্মকেন্দ্রিকতার জগৎ অতিক্রম করে বৃহত্তর জগতে প্রবেশ করে।
বিভিন্ন মনীষীদের দেশভ্রমণ: জ্ঞানার্জন, সম্পদ আহরণ, ধর্মপ্রচার ও রাজ্য জয় ইত্যাদি কারণে অনেক পর্যটক দেশভ্রমণ করেছেন। কলম্বাস ভারতের সাথে ইউরোপের একটি সমুদ্র পথ আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তিনি আমেরিকা মহাদেশ আবিষ্কার করে ফেলেন। গ্রিক রাজ্যদূত মেগাসস্থিনিস চন্দ্রগুপ্তের আমলে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তিনি এদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ১৩৩৬ সালে ইবনে বতুতা আফ্রিকার মরক্কো থেকে মুহাম্মদ বিন তুঘলকের আমলে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। এছাড়াও দুঃসাহসিক পর্যটক মার্কো পোলো, লিভিং স্টোন, ক্যাপ্টেন কুক, এন্ডারসনসহ অনেকেই দেশ আবিষ্কারের নেশায় জীবনের মায়া ত্যাগ করেছিলেন। দেশভ্রমণই পারে কোনো দেশ সম্পর্কে বাস্তব চিত্র তুলে ধরতে। তাই আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন ভ্রমণ-প্রেমী মনীষীদের কাছ থেকে দেশভ্রমনের জন্য উৎসাহিত হই।
উন্নত দেশের ভ্রমণপ্রিয় মানুষ: উন্নত দেশের মানুষ সাধারণত বেশি ভ্রমণপ্রিয় হয়ে থাকে। তারা শীতকালে দেশভ্রমণের জন্য বের হয়ে পড়ে। আবার উন্নত দেশের ছাত্ররাও ভ্রমণ প্রিয় হয়। তারা শিক্ষা জীবনের ফাঁকে ফাঁকে সুযোগ পেলেই ভ্রমণে বের হয়ে যায়। এই সব ভ্রমণগুলোই তাদের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনে সাহায্য করে। এ ভাবেই উন্নত দেশের ভ্রমণপ্রিয় লোকেরা ভ্রমণের মাধ্যমে নানা অভিজ্ঞতা অর্জন করে এবং জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তোলে।
দেশভ্রমণ ও বাংলাদেশ: বাংলাদেশ একটি প্রাচীন দেশ। এর রয়েছে হাজার বছরের পুরানো ইতিহাস ও ঐতিহ্য। বাংলাদেশ এই প্রাচীনত্বের জন্য সারাবিশ্বে পরিচিত। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই দেশে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারা দারুণভাবে উন্নতি লাভ করেছে। দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য প্রাচীনকাল থেকেই নানা পর্যটকদের আকর্ষণ করে আসছে। বর্তমানে বাংলাদেশের পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশের পর্যটন স্থান এবং পুরাকীর্তিগুলো দেখার জন্য প্রতি বছরই বিদেশি পর্যটকরা পাড়ি জমাচ্ছে।
বাংলাদেশের পর্যটন স্থানসমূহ: বাংলাদেশের পর্যটন স্থানসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো সেন্টমার্টিন দ্বীপ। এটি বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বাংশে অবস্থিত একটি প্রবাল দ্বীপ। এখানে বছরজুড়ে পৃথিবীর নানা দেশের বহু মানুষের ভিড় লেগে থাকে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত এবং বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন এলাকা হলো কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত। এখানেও বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগেই থাকে। এছাড়াও রয়েছে খুলনা জেলার সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, সিলেটের তামাবিল, চা বাগান, জাফলং এবং চট্টগ্রামের ফয়েজ লেক প্রভৃতি। এগুলো পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় জায়গা হিসেবে স্বীকৃত।
বাংলাদেশের পুরাকীর্তি সমূহ: বাংলাদেশে অনেক দর্শনীয় পুরাকীর্তি রয়েছে, যেগুলো ভ্রমণকারীদের নানাভাবে আকর্ষণ করে থাকে। নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার বা সোমপুর বিহার বৌদ্ধ সংস্কৃতির ধ্বংসাবশেষ যা সত্যিই দেখার মতো। কুমিল্লা জেলার শালবন বৌদ্ধ বিহারও ভ্রমণকারীদের নিকট অতি প্রিয় স্থান। এছাড়াও রয়েছে নরসিংদীর উয়ারী বটেশ্বর, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, বগুড়ার মহাস্থানগড়, ঢাকার আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, কার্জন হল, ঢাকেশ্বরী মন্দির প্রভৃতি। এই পুরাকীর্তিগুলোও ভ্রমণকারীদের মনোযোগ আকর্ষণ করে।
উপসংহার: বর্তমানকালে পৃথিবীর প্রায় সকল শ্রেণির মানুষের কাছে দেশভ্রমণ বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। আধুনিক সভ্যতার যাতাকলে মানুষের জীবন জটিল ও কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে মানুষের মধ্যে নানা ধরণের একঘেয়েমি মনোভাব ও ক্লান্তিবোধ কাজ করে। আর এই সব একঘেয়েমি ও ক্লান্তিকর জীবনে ভ্রমণই একমাত্র শান্তি দিতে পারে। তাই আমাদের জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে হলে এবং মনকে সজীব রাখতে হলে ভ্রমনের কোনো বিকল্প নেই।


No comments:

Post a Comment