Search This Blog

Tuesday, February 14, 2017

গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া

গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া
ভূমিকা: মানব সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান পরিবেশে আজ মহাসঙ্কটের সম্মুখীন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশে মানব সভ্যতার অগ্রগতির পাশাপাশি বলি হচ্ছে বিশ্ব প্রকৃতি ও পরিবেশ। প্রাকৃতিক সম্পদের বৈচিত্র্যপূর্ণ ও ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মানবজাতি যেমন সফলতার স্বর্ণশিখরে আরোহন করেছে তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে পৃথিবীকে সর্বনাশা পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মূলত পরিবেশ দূষণের যে ভয়াল থাবা আজ মানব সভ্যতাকে নিশ্চিত ধ্বংসের মুখে দাঁড় করিয়েছে তা হলো গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া।
গ্রিন হাউস: ইংরেজি Green House শব্দের বাংলা অর্থ সবুজ ঘর। মেরু অঞ্চল ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশসমূহে সূর্যালোকের স্বল্পতার কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় শাক-সবজির সংকট তীব্র আকার ধারণ করে। তাই সেখানে বিজ্ঞানীরা চাষাবাদের জন্য বিশেষ ধরণের কাঁচের  ঘর আবিষ্কার করেন। তীব্র ঠান্ডা হতে রক্ষা করার জন্য এ ঘরে শাক-সবজি ও গাছপালা লাগানো হয়। কাঁচ তাপ কুপরিবাহী হওয়ায় সূর্যালোক কাঁচের ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে ভেতরের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে। কিন্তু ভেতরের উত্তাপ পুনঃবিকরিত হয়ে বাইরে যেতে পারে না এবং বাইরের ঠান্ডাও ভেতরে আসতে পারে না। এই কাঁচের ঘরের মধ্যে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারে বলে বৈরি ও ঠান্ডা পরিবেশেও গাছপালা সহজে জন্মাতে পারে। বিজ্ঞানীরা এ বিশেষ ঘরের নাম দিয়েছেন গ্রিন হাউস।
গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া: প্রখ্যাত সুইডিস রসায়নবিদ সোভেনটে আরহেনিয়াস ১৮৯৬ সালে প্রথম Green House Effect ধারণাটি ব্যবহার করেন। পৃথিবীকে ঘিরে বায়ুমন্ডলে বিভিন্ন গ্যাসের স্তর রয়েছে। সূর্যের আলো মহাকাশ পেরিয়ে এই গ্যাসের স্তর ভেদ করে পৃথিবী পৃষ্ঠে পৌঁছে ভূ-পৃষ্ঠকে উত্তপ্ত করে। এ উত্তাপের অনেকাংশই পুনঃবিকিরিত হয়ে মহাশূন্যে ফিরে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা পৃথিবীর বায়ূমন্ডল তাপ কুপরিবাহী বিভিন্ন গ্যাসের আবরণ সৃষ্টি হয়েছে। এই গ্যাসীয় আবরণ সূর্য হতে প্রাপ্ত তাপ ধরে রাখে। গ্রিন হাউসের কাঁচের মতো এই গ্যাসীয় আবরণ। এই তাপ নিরোধক গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।  এই অবস্থাকে বিজ্ঞানীরা গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
গ্রিন হাউস গ্যাস: গ্রিন হাউস গ্যাসগুলো ভূ-পৃষ্ঠের বিকিরিত তাপের একটি অংশ আটকে রেখে বায়ুমন্ডলকে উত্তপ্ত করে। গ্রিন হাউস গ্যাসগুলো হলো- ১। কার্বন-ডাই-অক্সাইড (Co_{2})- ৫০% ২। মিথেন (CH_{4})- ১৯% ৩। ক্লোরে ফ্লোরো কার্বন (CFC)- ১৭% ৪। নাইট্রাস অক্সাইড (N_{20})- ৪% ৫। ওজোন (O_{3})- ৮% ৬। জলীয় বাষ্প- ২%। পৃথিবীর স্বাভাবিক ও অনুকূল পরিবেশের জন্য এ গ্যাসগুলোর পরিমিত উপস্থিতি জরুরি হলেও বর্তমানে বায়ুমন্ডলে এদের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।
গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার উৎস বা কারণ: পৃথিবীর জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এই বর্ধিত জনসংখ্যার কারণে প্রকৃতিতে যেমন কার্বন-ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ছে তেমনি বাড়তি জনসংখ্যার বাসস্থান ও খাদ্য যোগানে চাষাবাদের জন্য উজাড় করছে বন-জঙ্গল। অথচ বনাঞ্চলই পরিবেশে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের ভারসাম্য বজায় রাখে। আবার জনসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন ও শিল্পকারখানা। এগুলো থেকে নির্গত ধোঁয়া থেকে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি যেমন: তেল, গ্যাস, কাঠ, কয়লা ইত্যাদি দহনের ফলে প্রকৃতিতে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে চলেছে। গৃহস্থলী পণ্য যেমন ফ্রিজ, এয়ারকন্ডিশন, রেফ্রিজারেটর, বিভিন্ন স্প্রে থেকে সিএফসি গ্যাস নির্গত হয়। এসব গ্যাস পৃথিবীর সামগ্রীক পরিবেশকে উত্তপ্ত করে প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনছে। মূলত এসবই গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়ার কারণ বা উৎস।
গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার প্রভাব: গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া বিশ্ববাসীর জন্য করুণ পরিণতি আর প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনছে। গ্রিন হাউসের মারাত্মক প্রতিক্রিয়া ভূ-পৃষ্ঠ ও বায়ুমন্ডলকে ক্রমেই উত্তপ্ত করছে। গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ায় ইতোমধ্যে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করেছে ও সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এভাবে সমুদ্রের পানির উচ্চতা ১-১.৫ মি. বেড়ে ২০৫০ সাল নাগাদ মালদ্বীপের মতো দেশগুলোর নিম্নাঞ্চল পানির নিচে চিরতরে তলিয়ে যাবে। উদ্বাস্তু হবে ২০ কোটি মানুষ। তাছাড়া সূর্যের অতিবেগুনী রশ্মির প্রভাবে ত্বক ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। পৃথিবীর বিভিন্ন বনাঞ্চলে দাবানল দেখা দিবে। সবুজ-শ্যামল পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হবে। এছাড়া অতিবৃষ্টি, এসিড বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস পৃথিবীর জীবন-জীবিকাকে বিপন্ন করবে।
ওজোন স্তরে বিপর্যয়: মানুষ এয়ার কন্ডিশনার, প্লাস্টিক ফোম, রেফ্রিজারেটর, এ্যারোসোল ইত্যাদি ব্যবহার করে যা থেকে সিএফসি নামক ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরিত হয়। এই গ্যাস প্রাকৃতিক নিরাপত্তাবেষ্টনী বায়ুমন্ডলের ওজোন স্তরকে ধ্বংস করছে। এই ওজান স্তর সূর্যালোকের ক্ষতিকারক অতিবেগুন রশ্মিকে ফিল্টার করে পৃথিবীতে প্রবেশ করায় এবং বিকিরণ প্রক্রিয়ায় ভূ-পৃষ্ঠের তাপকে পুনরায় মহাশূন্যে ফিরে যেতে সাহায্য করে। অধিক হারে সিএফসি গ্যাসের উপস্থিতি এবং মহাশূন্যে মহাকাশযানের ক্রমাগত উৎক্ষেপণ ওজোন স্তর ছিদ্র করে দিচ্ছে। এটি মানুষসহ জীবকূলের জন্য মহাবিপদ ডেকে আনবে এবং আগামীতে অস্তিত্বের জন্য উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আর কিছুই করার থাকবে না।
কৃষিতে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার প্রভাব: গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঞ্চল তলিয়ে গেলে ঐসব অঞ্চলে খাদ্যশস্যের উৎপাদন বহুলাংশে হ্রাস পাবে। মানুষ প্রয়োজনীয় খাদ্য যোগাড় করতে ব্যর্থ হবে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে স্থলভাগের নদী-নালা, খাল-বিল, হাওড়-বাওড় ইত্যাদি জলাশয়ের পানি শুকিয়ে যাবে। এতে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। এছাড়া ফল ও বীজ পুষ্ট হবে না। ফসলে ফল-ফুলের পরিমাণ কমে যাবে। ফল মূল ও শাক-সবজির স্বাদ বদলে যাবে। গাছের বৃদ্ধি কমে যাবে ও নানান রোগের প্রকোপ বেড়ে যাবে। বহু গাছপালার ও উদ্ভিদের বিলুপ্তি ঘটবে। সবমিলিয়ে খাদ্যশস্যের অভাব সামগ্রিক জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনবে।
বাংলাদেশে গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার প্রভাব: গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট বিশ্ব উষ্ণায়নের মারাত্মক প্রভাব থেকে বাংলাদেশও মুক্ত নয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি ৩ মি. বৃদ্ধি পায় তাহলে ভোলা, হাতিয়া, সন্দ্বীপ, সেন্টমার্টিন প্রভৃতি দ্বীপ এবং বরিশাল, পটুয়াখালী, খুলনা, সাতক্ষীরা ও সিলেটের হাওড় অঞ্চল তথা দেশের দশ ভাগের ১ ভাগ এলাকা তলিয়ে যাবে এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগার বিলুপ্ত ও জলজ সম্পদ বিনষ্ট হবে। প্রায় ১৫% আবাদযোগ্য জমি ও ৩.৩০% বনাঞ্চলের ক্ষতি হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০০ সে.মি বৃদ্ধি পেলে ২৫০০০ বর্গ কি.মি এলাকায় লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঘটবে। এতে জমি কৃষিবাদের অনুপযোগী হবে ও স্বাদুপানির উৎস বিলুপ্ত হবে। এছাড়া গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে মরুকরণ, এসিড বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, আবহাওয়াগত বিপর্যয় ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে।
গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের উপায়: গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট মহাবিপর্যয় সম্পর্কে সারাবিশ্বের বিজ্ঞানীরা আজ সতর্ক। তারা উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎকে কিভাবে এর প্রতিকূল প্রভাব থেকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে ভাবছেন। গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের উপায়গুলো নিম্নরূপ-
- সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অধিক হারে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। কারণ একমাত্র বৃক্ষই কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ করে।
- অবাধে বৃক্ষ নিধন ও বনভূমি ধ্বংস রোধ করতে হবে।
- ১টি গাছ কাটার আগে ৪/৫টি গাছ লাগাতে মানুষকে উৎসাহিত করতে হবে।
- জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও সমুদ্রস্রোতকে কাজে লাগাতে হবে।
- যেসব গ্যাস বায়ুমন্ডলের উত্তাপ বাড়ায় ও ওজন স্তরের ক্ষতিসাধন করে তা নিঃসরণ কমাতে হবে।
- জ্বালানি হিসেবে লাকড়ি এবং আসবাবপত্র, দরজা-জানালা তৈরিতে কাঠের বিকল্প ব্যবহার করতে হবে।
- শিল্পকারখানায় গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কম হয় এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে।
- স্বাদু পানির জলাশয় ও নদীতে সমুদ্রের লোনা পানির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে।
- বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকে পানিতে নিমজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে প্রয়োজনীয় বাঁধ দিতে হবে।
- গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়ার খারাপ দিক সম্পর্কে সকলকে সচেতন হতে হবে।
উপসংহার: জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন ও প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে জীবনকে সুখী ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে গিয়ে মানুষ প্রাকৃতিক সম্পদের বিনাশ সাধন ও অপব্যবহার করছে। আর এরই নির্মম পরিণতি হলো গ্রিন হাউস প্রতিক্রিয়া। ফলে আমাদের আশ্রয়দাত্রী পৃথিবীর পরিবেশ ও জনজীবন আজ হুমকির মুখোমুখি। তাই নিরাপদ পরিবেশ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় পৃথিবীতে বাস করার জন্য উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশকে আরো সচেতন হয়ে একযোগে কাজ করতে হবে। গ্রিন হাউজ প্রতিক্রিয়ার প্রভাব মোকাবেলায় দূরদর্শী চিন্তাভাবনা ও সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা, উদ্যোগ, পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে সকলকে।


No comments:

Post a Comment