Search This Blog

Thursday, February 16, 2017

দয়া

দয়া
ভূমিকাঃ কেবল জন্ম নিয়েই মানুষ মানুষ হয়ে ওঠে না। মানুষ জন্মগতভাবে একান্ত অসহায়। তাই জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কোনো না কোনো কাজে একজনকে অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়। শৈশবে মানব সন্তান মাতা-পিতার মুখাপেক্ষী হয়, আর বৃদ্ধ বয়সে তাকে অন্যের উপর আরো বেশি নির্ভরশীল হতে হয়। কর্মসংস্থান, বিদ্যার্জন, খাদ্য যোগাড়, গৃহ নির্মাণ, রোগের প্রতিকার, ধর্মশিক্ষা- প্রভৃতি কাজে একে অপরের সাহায্য নিতে হয়।
মানব  জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অন্যের দানে ও দয়ায় ধন্য। Ruskin বলেন, "There are three kinds of duties-duties towards God, duties towards parents and duties towards man."
দয়া কীঃ দয়া বলতে আমরা সাধারণত বুঝি ভিখিরিকে ভিক্ষা দেওয়া। আসলে সত্যিকারের দয়া বলতে বুঝায় প্রবল সহযোগিতা ও সমর্থন। এটা মানুষের প্রতি হতে পারে আবার অন্যান্য জীবের প্রতিও হতে পারে। অপরের দুঃখ-দুর্দশা উপলব্ধি করে তাকে সহযোগিতার মানসিকতাই দয়া। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সমাজের সকলকে সত্যিকারের দয়া প্রদর্শনের মাধ্যমে মঙ্গল সাধিত হয় সমাজ ও ব্যক্তির, উৎকর্ষ সাধন হয় মানবাত্মার।
দয়ার স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্যঃ সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ সাধনের জন্য কর্ম পরিচালনা, ভূমিকা পালন কিংবা অবদান রাখাই হচ্ছে দয়ার ধর্ম। কিংবা সহজ কথায় বলা যেতে পারে মানুষের সেবা এবং উপকারই দয়া। দয়া বলতে শুধুমাত্র দরিদ্র, অন্ধ, অনাথ, ভিখারীকে কিছু সাহায্য দান করা বোঝায় না, নিস্বার্থভাবে মানুষকে সাহায্য করাকেই বোঝায়। জগতের সকলেই স্রষ্টার সৃষ্টি। তাই সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনা বুঝে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের উপকার করার নাম দয়া। এই দয়াধর্ম এবং সেবার দ্বারা মানুষ পৃথিবীতে রচনা করতে পারে স্বর্গীয় পরিবেশ। সকলের সঙ্গে মিলে মিশে জীবনধারণ এবং সুখে-দুঃখে একে অন্যের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নিহিত। পবিত্র কোরআন শরীফে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলা হয়েছে। এই শ্রেষ্ঠত্বের জন্যই অসংখ্য কর্তব্যের বাঁধনে বাঁধা মানব জীবন। আর বিভিন্ন কর্তব্যের মধ্যে মানুষের প্রতি দয়া-অনুকম্পা প্রদর্শন হলো তার অন্যতম প্রধান কর্তব্য।
ধর্মের দৃষ্টিতে দয়াঃ জগতের সবাই এক অদৃশ্য শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই শক্তিই হচ্ছে স্রষ্টা। স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জনই মানুষের মূল উদ্দেশ্য। মানবের সেবা বা মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের দ্বারাই স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভ সম্ভব। আমাদের মনে রাখা দরকার সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।মানুষ হচ্ছে সৃষ্টির সেরা জীব-আশরাফুল মাখলাকুত। মানুষকে দয়া করার মধ্যেই মানব জীবনের সকল কল্যাণ নিহিত রয়েছে। জগতের ধর্মগুরু ও ধর্মপ্রবক্তারা দয়াধর্মকেই জীবনের শ্রেষ্ঠ ধর্ম বলেছেন। মহানবী (স.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ যিনি মানুষের উপকার করেন।বিভিন্ন ধর্ম শাস্ত্র, কোরআন, পুরান, মহাকাব্যে দয়াধর্মকেই শ্রেষ্ঠধর্মের মর্যাদায় ভূষিত করা হয়েছে।
জীবন ও সমাজে দয়ার গুরুত্বঃ স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন, ‘জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর।অর্থাৎ জীবকে সেবা করলে বা দয়া করলে সৃষ্টিকর্তাকেই সেবা করা হয়। জীবের প্রতি দয়া প্রদর্শন প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজ আপনা আপনিই শান্তিময় এবং শৃঙ্খলিত হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে জীব-জন্তু, পশু-পাখি সবাইকেই দয়া প্রদর্শনের চর্চা করতে হবে। মহানবী হযরত মুহম্মদ (স.), গৌতম বুদ্ধ, শ্রীকৃষ্ণ সকলেই পশু-পাখির প্রতি অতিশয় দয়া প্রদর্শন করেছেন এবং অন্যকেও দয়া প্রদর্শনের কথা বলেছেন।
নিঃস্বার্থ দয়া মনুষ্যত্বের পরিচায়কঃ অন্তরের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে মানুষ মানুষকে ভালোবাসতে শেখে, দয়া করতে শেখে। এটি মানুষের এক মহৎ গুণ। স্বার্থপরতা কখনো মানুষের গুণ হতে পারে না। কেবল নিজ পুত্র-কন্যা-স্ত্রী তথা আপন সংসার নিয়ে নিমগ্ন জীবন কখনো সার্থকতা ও পরিপূর্ণতা পায় না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাই বলেছেন-
স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ বৃহৎ জগৎ হতে
সে কখনো শেখেনি বাঁচিতে।
আত্মতৃপ্তি লাভের অন্যতম উপায় হচ্ছে দয়া। অসহায়কে সাহায্য করলে, দয়া করলে তার মন কৃতজ্ঞতায় ভরে ওঠে। সে সৌন্দর্য দেখে সেবাপরায়ণকারীর হৃদয়ে অফুরন্ত আনন্দের সঞ্চার হয়। পীড়িতের সেবা করে যিনি জীবনকে সার্থক মনে করেন তিনিই প্রকৃত সেবক।
চরিত্র গঠনে দয়ার ভূমিকাঃ চরিত্র মানুষের অমূল্য সম্পদ। চরিত্রবান মানুষের খ্যাতি ও মহত্ত্ব দয়াব্রতগুণে আরও মধুর হয়ে ওঠে। মানুষ যদি শিশুকাল থেকেই দয়া অনুকম্পাপূর্ণ পরিবেশে বড় হয় তবে তার মধ্যেও দয়াপূর্ণ সুকুমার প্রবৃত্তির জন্ম হয়। দয়াদ্র হৃদয়ের গুণেই মানুষ নিজেকে মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে পারে। তার চারিত্রিক গুণাবলি তখন অধিক প্রশংসনীয় হয়ে ওঠে এবং সমাজে সে হয় অনুস্মরণীয়।
নির্বিচারে দয়া প্রদর্শন অনুচিতঃ অলস ব্যক্তিকে কখনোই দয়া প্রদর্শন করা ঠিক নয়। অনেকে আছে শুধু অন্যের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে জীবনযাপন করে, কিন্তু নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে না। দিনের পর দিন এরা অন্যের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। তাই দয়া-দাক্ষিণের ক্ষেত্রে বিচার বিবেচনা করা জরুরি। এমন মানুষকে সাহায্য বা দয়া করতে হবে যার সাবলম্বী হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা এবং প্রচেষ্টা আছে।
কৈশোরে দয়া শিক্ষাঃ দয়া মানুষের একটি অন্যতম মহৎ গুণ। এ গুণ অর্জনের জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রয়োজন না হলেও পৃথিবীব্যাপী কিশোর-কিশোরীদের জন্যে এ শিক্ষার ব্যবস্থা আছে। যেমন-বিদ্যালয়ের কিশোরদের জন্য সেবাব্রতী দল (Boy scouts) গঠন করা হয়। ভ্যান রেয়ার্দ' Bot pioneers of America' নামে ছেলেদের নিয়ে একটি সেবামূলক দল গঠন করেন। সিটন সাহেব 'Wild cat bonds' নামে একটি ছেলের দল সৃষ্টি করেন। এসব সংগঠনের মাধ্যমে কিশোররা মানুষের প্রতি উপকারী মনোভাব ও দয়াশীল হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।
উপসংহারঃ দয়া প্রত্যেক মানুষেরই এক সৎ ও মহৎ হৃদয়বৃত্তি এবং অনন্য মানবধর্ম। এই হৃদয়বৃত্তি ও মানবধর্মের জাগরণই মনুষ্যত্বের পরিচায়ক। মানুষ কেবল স্বার্থ আর সম্পদের যন্ত্র নয়। বিরাট মহিমার উপলব্ধিতে সে জীবনকে সার্থক ও অর্থময় করে তুলতে চায়। আর দয়াসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই মানুষ তার জীবনকে সার্থক, সুন্দর, অর্থময় করে তুলতে পারে। মানুষের জীবনে যদি মহৎ সেবাব্রতের পূর্ণ দীক্ষা থাকে তবে একদিন এই পৃথিবীতে প্রেমের পূর্ণ অভিষেক হবে।


No comments:

Post a Comment