Search This Blog

Friday, February 17, 2017

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা

ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা
ভূমিকা: বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতির সাথে মিলে মিশে আছে বিভিন্ন ধরণের মেলা। আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা আমাদের সংস্কৃতির আধুনিকতম সংযোজন। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। ঢাকার শেরে বাংলানগরে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পাশে বিশাল চত্বরে প্রতি বছরের জানুয়ারি মাসব্যাপী এ মেলা বসে দেশ-বিদেশের নানান ধরণের পণ্য নিয়ে। মেলায় আমাদের নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রসহ সৌখিন দ্রব্যাদি এবং প্রায় সব ধরণের ইলেক্ট্রিক পণ্য পাওয়া যায়। এই মেলা আমাদের বাণিজ্যের প্রসারকে তরান্বিত করে, তাই এই মেলা
আমাদের অর্থনীতির জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ।
প্রথম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা: দেশি-বিদেশি শিল্পোদ্যোক্তাদের মধ্যে পারস্পরিক সেতু বন্ধন, সম্পর্কোন্নয়ন এবং দেশে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রী বিদেশি ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের কাছে পরিচিত করে বৈদেশিক বাণিজ্যকে আরও চাঙ্গা করে তোলার উদ্দেশ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্য মেলা অনুষ্ঠিত হয় এবং এই মেলায় প্রথম বারের মতো বিদেশি ব্যবসায়ীরা অংশগ্রহণ করে। ১৭টি দেশের ৭১টি কোম্পানি ও ব্যবসায়িক সংগঠন এই মেলায় অংশগ্রহণ করে। ৭ জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ২৩ দিন এই মেলা চলে। ১১ লক্ষ বর্গফুট জুড়ে বিশাল চত্বরে ২৭টি প্যাভিলিয়ন, ২২টি মিনি প্যাভিলিয়ন, ১৬৪টি স্টল এর সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত হয় এই মেলা। প্রাথমিকভাবে কিছুটা ত্রুটি থাকলেও এই মেলা বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং ব্যবসায়ীরা অনেক মুনাফা অর্জনে সক্ষম হয়।
মেলার বাণিজ্যিক গুরুত্ব: পণ্যের প্রসার ও বাজার সম্প্রসারণে বাণিজ্য মেলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ মেলার মাধ্যমে দেশীয় উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিদেশিরা তাদের পণ্য প্রদর্শন করে। এতে বিদেশি পণ্যের সাথে আমাদের দেশীয় পণ্যের মানের তুলনা করা সম্ভব হয়। বিদেশি ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের সাথে আমাদের দেশের ব্যবসায়ীদের ভাব বিনিময় সম্ভব হয়। যার মাধ্যমে দেশীয় পণ্যের প্রসার ঘটানো যায়। দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড় আসর ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। দেশীয় পণ্যের পরিচিতি ও উৎকর্ষ সাধনে তাই বাণিজ্য মেলার গুরুত্ব অপরিসীম। তাছাড়া দেশের রপ্তানি বাণিজ্য বৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে বাণিজ্য মেলা কার্যকর ভূমিকা পালন করে। দেশি-বিদেশি ক্রেতারা আমাদের দেশে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের সাথে পরিচিত হতে পারে। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে আমাদের দেশে উৎপাদিত পণ্যকে জনপ্রিয় করতে ও পণ্যের মান বাড়াতে এই বাণিজ্য মেলা যথেষ্ট গুরুত্ব বহন করে।
মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব: মেলার আন্তর্জাতিকায়নের ফলে প্রচুর বৈদেশিক ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। তাছাড়া বৈদেশিক ক্রেতা ও দর্শকেরও সমাগম ঘটে। মেলায় আমাদের উৎপাদিত দেশীয় পণ্য যেমন তাঁত শিল্প ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পসামগ্রী বিদেশিদের কাছে খুব আকর্ষণীয় হয় বলে এগুলো বিক্রিও হয় প্রচুর। লাভবান হয় আমাদের ক্ষুদ্র শিল্পগুলো। দেশীয় বড়ো বড়ো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোও এই মেলা থেকে প্রচুর মুনাফা অর্জনের সুযোগ পায়। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থনৈতিকভাবে কিছুটা হলেও এগিয়ে যেতে পারে। এছাড়া মেলায় অংশগ্রহণকারী দেশি-বিদেশি কোম্পানির কাছ থেকে সরকার মোটা অঙ্কের রাজস্ব পায়। টিকিট বিক্রয়ের মাধ্যমেও সরকারের অর্জিত হয় বেশ কিছু অর্থ।
বাণিজ্য মেলার প্রয়োজনীয়তা: বাণিজ্য মেলা একটি দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামোর সাথে সম্পর্কিত। দেশের অর্থনীতির প্রসারে বাণিজ্য মেলা সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাই দেশের মূল শক্তি অর্থনীতির সমৃদ্ধ অবকাঠামো গঠনে বাণিজ্য মেলার আয়োজন যথেষ্ট প্রয়োজনীয়। তাছাড়া যেহেতু আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় বিভিন্ন দেশের বণিকশ্রেণি তাদের স্ব স্ব দেশের নানান ধরণের পণ্য নিয়ে হাজির হয়, তাই দেশীয় ব্যবসায়ী নিত্য নতুন পণ্যের সাথে পরিচিত হয়। এতে দেশীয় উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন পণ্য প্রস্তুতের ধারণা পায় এবং দেশীয় ব্যবসায়ীদের বিদেশি ব্যবসায়ীদের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা হয়। তাছাড়া বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রচার ও প্রসার পায়। এই আন্তর্জাতিক মেলা থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। অর্থাৎ দেশের বাণিজ্য ও অর্থনীতির সমৃদ্ধির জন্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা খুবই প্রয়োজনীয়।
বাণিজ্য মেলা ২০১৪: ১১ জানুয়ারি ২০১৪ হতে ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত এক মাসব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ১৯তম ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরোর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই মেলায় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন সরকারি-বেসরকারি উৎপাদনকারী, বণিক সমিতি, রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানসহ ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, হংকং, যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশের বিভিন্ন বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। বাণিজ্য মেলার ১৯তম এই আয়োজনে সর্বমোট স্টল ছিল ৪৮৪টি। এর মধ্যে ৯২টি সাধারণ, প্রিমিয়াম ও বিদেশি প্যাভিলিয়ন ৪৯টি, মিনি প্যাভিলিয়ন ৩২৯টি, ১০টি রেস্তোরাঁ এবং একটি চিকিৎসা কেন্দ্রও ছিল।
বাণিজ্য মেলায় প্রযুক্তির ব্যবহার: ২০১১ সাল থেকে ঢাকা আন্তর্জাতিক মেলা অনলাইনে সরাসরি প্রচার শুরু হয়। বাংলাদেশের অন্যতম তথ্য ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিওপ্ল্যান বাংলাদেশএবং নিউজনেটএই ওয়েবসাইটটি তৈরি করে। মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তাদের পরিচিতি, মেলা উপলক্ষে বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফার, পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রদান ও পণ্যবিক্রয় করতে পারে। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর যোগাযোগের মাধ্যম, প্রোফাইল ও পণ্যের তালিকা থাকে এখানে। ফলে ক্রেতারা মেলাতে না গিয়েও ঘরে বসে অনলাইনে তাদের প্রয়োজনীয় ও পছন্দের জিনিস যাচাই করে কিনতে পারবেন। তাছাড়া নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য মেলার প্রধান ফটক ও বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো ক্লোসড সার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়।
উপসংহার: জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান বাহক হলো বাণিজ্য। বাণিজ্য মেলা তাই আমাদের অর্থনীতির উন্নয়নে সহায়ক। আমাদের দেশীয় ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করে এবং তাদের পণ্য বিক্রয় করে প্রচুর মুনাফা অর্জন করে। আমাদের বাণিজ্যের প্রসার এবং উন্নয়ন ঘটার সুযোগ পায় এই বাণিজ্য মেলার ফলে। তাছাড়া দর্শক-ক্রেতারা নিত্য নতুন দেশি-বিদেশি পণ্যের সাথে পরিচিতি ও ক্রয়ের সুযোগ পায় এই মেলায়। সর্বোপরি বলা যায় বাণিজ্য মেলা আমাদের অর্থনীতির গতি সঞ্চারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

No comments:

Post a Comment