Search This Blog

Saturday, February 18, 2017

পথশিশু

পথশিশু
ভূমিকা:
এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংস্তুপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব-তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ-শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।
কবিতায় শিশুদের জন্য পৃথিবীকে বসবাস উপযোগী করে যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করেন
কবি সুকান্ত বহুকাল আগে। আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, দেশ ও জাতির ভবিষ্যতের কর্ণধার। শিশুদের মধ্যেই সুপ্ত থাকে ভবিষ্যতের কবি, শিল্পী, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, চিকিৎসক ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিভা। শিশুদেরকে আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে প্রতিটি অভিভাবক চেষ্টা করে থাকেন। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ছিন্নমূল শিশু আছে যারা তাদের অধিকার বঞ্চিত হয়ে অনাদরে-অবহেলায় দিন কাটায়। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ইত্যাদি মৌলিক অধিকার বঞ্চিত এ দেশের দরিদ্র ও অসহায় শিশুরা।
পথশিশু কারা: যে সব শিশু পিতৃ কিংবা মাতৃহীন, মা তালাকপ্রাপ্ত কিংবা বাবা মারাত্তক দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত, মাদকাসক্ত কিংবা মাতা-পিতা সংসার চালাতে না পারায় শিশুরা ঘরের বাইরে চলে যায়, রাস্তায় বসবাস শুরু করে এমন শিশুদের সাধারণত পথশিশু বলা হয়।

পথশিশু হওয়ার কারন: পিতা-মাতার বহু বিবাহ, মৃত্যু, সৎ বাবা-মা দ্বারা নির্যাতিত, ভূমিহীন হওয়া, কোনো প্রকার আশ্রয় না পাওয়া, পরিবারের সদস্য সংখ্যা আর্থিক সঙ্গতির অনুপাতে বেশি হওয়া, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, রাগ করে ঘর থেকে পালানো ইত্যাদি কারণে শিশুরা ঘর থেকে বের হয়ে পথে আশ্রয় নেয়। ওরাই পথশিশু। পথশিশুদের মধ্যে মেয়ে শিশুরা সাধারণত বন্ধুবান্ধব, আত্দীয়-স্বজন, প্রতিবেশীর কাছ থেকে প্ররোচিত হয়ে শহরে আসে। ছেলে শিশুরা নিজেরাই চলে আসে শহরে। গ্রাম ছেড়ে তারা শহরের খোলা আকাশের নিচে, ব্রিজের নিচে, মার্কেট, পার্ক, বাস ও রেল স্টেশনসহ বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়। বাজার ও নৌ বা বাস টার্মিনালকেন্দ্রিক তাদের বসবাস। তারা ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহ, বাদাম বিক্রি, কুলি, সিগারেট বিক্রি, হোটেলে পানি দেওয়া, হোটেল বয়, গাড়ি ধোয়া-মোছা, ফুল বিক্রি, গৃহস্থালি কাজ, ভাসমান যৌনকর্মী, মাদক বিক্রি, চুরিসহ নানা কাজের সঙ্গে জড়িত।
পথশিশুর জীবনজীবিকা: নৌ বা বাস টার্মিনালে তারা রাত-দিন কাজ করে অল্প টাকা আয় করে। এ টাকা দিয়ে রাস্তার ধারে খাবারের দোকান, ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান থেকে খাবার কিনে খায়। আয় না হলে না খেয়েই দিন যাপন করে। এজন্য অধিকাংশ পথশিশু অপুষ্টিতে ভোগে। চর্মরোগ, ডায়রিয়া, ঠাণ্ডা জ্বর, জন্ডিসসহ নানা রোগে তারা আক্রান্ত হয়। অসুস্থ হলে চিকিৎসার সুযোগ থেকে তারা বঞ্চিত। একটি শার্ট, প্যান্ট পরেই তাদের দিন কাটাতে হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভেজা কাপড় পথশিশুরা তাদের গায়ে শুকায়। কারণ তাদের গোছল করা ও কাপড় ধোয়ার জন্য পর্যাপ্ত পানির অভাব। অন্যদিকে চুরি বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের হাতে পথশিশুরা প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয়।
আশ্রয়কেন্দ্র:সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে সারা দেশে ৬টি ভবঘুরে আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে, যেখানে মোট আসন সংখ্যা ১ হাজার ৯শ'। অথচ বর্তমানে সেখানে ৩১৯ জন শিশু রয়েছে। প্রতিবন্ধী ও ভবঘুরে পথশিশুদের সেবা-যত্নের কোনো ব্যবস্থা আশ্রয়কেন্দ্রে নেই। উপরন্তু এসব আশ্রয়কেন্দ্রে জনবলেরও অভাব রয়েছে। অথচ শিশু আইন ১৯৭৪-এর পঞ্চম ভাগে দুস্থ ও অবহেলিত শিশুদের তত্ত্বাবধান ও রক্ষণাবেক্ষণের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় শিশুনীতি ২০১০ (খসড়া) শিশুর অধিকার অংশের ৬.৪.৩নং ধারায়.....'শিশুর পরিত্যক্ত ও আশ্রয়হীন হওয়ার মৌলিক কারণ অনুসন্ধানসহ পরিত্যক্ত ও নিরাশ্রয় শিশুর আশ্রয় ও খাদ্যসহ সুরক্ষার ব্যবস্থা করার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।' সেখানে শিশুর সামাজিক অধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করেনি। পথশিশুদের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যেসব কার্যাবলী পরিচালিত হচ্ছে সেগুলো যেন শিশুদের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন, প্রশিক্ষণ, কাউন্সিলিং প্রভৃতি নিশ্চিত করে। ২০০৯-২০১০ অর্থবছরে পথশিশুদের জন্য প্রথমবারের মতো যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তা প্রায় ৭ লাখ শিশুর জন্য আশাব্যঞ্জক নয়। পথশিশুদের জন্য বাজেট বৃদ্ধি করতে হবে। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য সমাজের ধনী মানুষের সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে। বর্তমানে পথশিশুর জন্য যেসব কর্মসূচি চলছে সেগুলো শিশুর পুনর্বাসনমূলক।
পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা: অর্থাৎ কেউ পথশিশু হলে তাকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। অথচ পথশিশু তৈরি হওয়ার মৌলিক কারণ নিয়ে কোনো প্রকল্প বা কার্যক্রম চোখে পড়ে না। পথশিশু তৈরি হওয়ার যেসব কারণ বর্তমান সেগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাদের পড়াশোনার সুযোগ করে দেওয়া, কারেকশন সেন্টারে শিশুদের কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। তারা সমাজের জন্য বোঝা না হয়ে সম্পদে পরিণত হতে পারে। পথশিশুরা সব সময় বিভিন্ন ধরনের মানবিক ও সামাজিক নিগ্রহের শিকার হয়, সেজন্য ব্যাপকভিত্তিক জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
নৈতিক মূল্যবোধ: আমাদের সকলেরই পথশিশুদের প্রতি নৈতিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি করতে হবে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ না থাকলে মানুষের জীবন বিপথে পরিচালিত হয়। যে সব শিশুদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অভাব রয়েছে তারা অন্যায়ের দিকে পা বাড়ায়। শিশুদেরকে নৈতিকতার শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়াও পথশিশুদের জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের একটি দরিদ্র ও জনবহুল দেশ। আমাদের দেশের উন্নয়নের জন্য দেশের জনসংখ্যাকে কর্মমুখি শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে।
উপসংহার: মোট কথা, শিশুদের পরিপূর্ণ বিকাশের ওপর জাতীয় সমৃদ্ধি নির্ভরশীল। পথশিশুদের উন্নয়নের ব্যাপারে শুধু সরকারি কার্যক্রম নয় আমাদেরকে অনেক সচেতনতার সাথে কাজ করতে হবে। পথশিশুদের অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ করে তুলতে হবে, স্থায়ী সমাধানের চিন্তা করতে হবে। উপযুক্ত শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তারা যেন আতœনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে সে ব্যাপারে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। আলোকিত বাংলাদেশ গড়তে অবশ্যই পথশিশুদের জন্য মৌলিক অধিকারের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।

No comments:

Post a Comment