Search This Blog

Wednesday, February 8, 2017

সার্ক (SAARC)

সার্ক (SAARC)

ভূমিকা: দক্ষিণ এশিয়া পৃথিবীর একটি প্রাচীন ও বৈচিত্র্যময় জনপদ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক জোরদার ও উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে আঞ্চলিক সহযোগীতার প্লাটফর্ম হিসেবে ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সার্ক, সদস্য দেশগুলোর উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু আঞ্চলিক রাজনীতি ও সীমান্ত সমস্যার কারণে সার্ক তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে সফলতা দেখাতে পারেনি। তবে সকল বিরোধ মীমাংসা করে এবং দ্বন্দ্ব সংঘাত ও রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সদস্য দেশগুলোর উন্নয়নে সার্কের আরও কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলেই সার্ক প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে।

সার্ক পরিচিতি: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক সহযোগীতা সংস্থা হলো সার্ক (SAARC)SAARC এর পূর্ণাঙ্গ রূপ হলো- South Asian Association for Regional Co-operation. এই সংস্থাটি ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়। এর বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৮টি। সার্কের সদর দপ্তর নেপালের কাঠমুন্ডুতে অবস্থিত। প্রতিবছর সার্কভুক্ত দেশগুলোর সরকার/রাষ্ট্র প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া সার্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, বিশেষজ্ঞ ও মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।

সার্ক প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: বাংলাদেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশের নিকটবর্তী দেশসমূহ নিয়ে একটি আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা গঠনের চিন্তা করেন। এই উদ্দেশ্যেই ১৯৮০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার প্রস্তাব সম্বলিত একটি সুপারিশ প্রণয়ন করে। ১৯৮১ সালের ২১ এপ্রিল শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোতে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ-এ ৭টি দেশের পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কলম্বো বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগীতা সংস্থা গঠনে ঐকমত্য প্রকাশ করা হয় এবং সহযোগীতার ক্ষেত্রসমূহ লিপিবদ্ধ করা হয়। ১৯৮৫ সালের ৭ ও ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় ৭টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন। ১৯৮৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর সার্ক সনদ স্বাক্ষরিত হয়। এই সনদে ৮টি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এভাবে জন্ম নেয় সার্ক। সার্কের প্রথম সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন বাংলাদেশের আবুল আহসান এবং সচিবালয় প্রতিষ্ঠিত হয় নেপালের রাজধানী কাঠমুন্ডুতে।

সার্কের সদস্য রাষ্ট্রসমূহ: প্রতিষ্ঠাকালীন সার্কের সদস্য ছিল ৭টি। তবে ২০০৭ সালের মার্চে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত সার্কের শীর্ষ সম্মেলনে আফগানিস্তানকে সার্কের সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই সার্কের বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৮টি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, ভূটান, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তান সার্কের সদস্য।

সার্কের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য: বেশ কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সার্ক সনদঢাকা ঘোষণাঅনুযায়ী সার্কের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য গুলো হলো-

দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের কল্যাণ সাধন ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন।
অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ত্বরান্বিত করা। বিজ্ঞান ও কারিগরি ক্ষেত্রে সহযোগীতা দান।
সার্কভুক্ত দেশসমূহের আত্মনির্ভরশীলতা অর্জনে যৌথ প্রচেষ্টা গ্রহণ
পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধের মীমাংসা।
বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার সঙ্গে সহযোগীতা স্থাপন।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগীতা বৃদ্ধি ও অনুকূল অবস্থান গ্রহণ।
একে অপরের সার্বভৌমত্ব, ভূখন্ড গত অখন্ডতা ও স্বাধীনভাবে চলার নীতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং অপরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা।
সার্কের নীতিমালা ও কাঠামো: ১৯৮৫ সালের ৭ ও ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় দক্ষিণ এশিয়ার ৭টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার পর্যায়ের অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে সার্কের জন্ম হয়। এই বৈঠকেই সংস্থাটির নীতিমালা ও সাংগঠনিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়। সার্কের নীতিমালাগুলো হলো-

সহযোগীতার ভিত্তি হবে সম-সার্বভৌমত্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, পারস্পরিক সাহায্য ও অন্যের অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ না করার মনোভাব।
এ সহযোগীতা দ্বি-পাক্ষিক ও বহু-পাক্ষিক সহযোগিতার বিকল্প নয়, বরং তার সহযোগী।
ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংস্থার আলোচনা হবে এবং বিতর্কিত বিষয় পরিহার করা হবে।
সাংগঠনিক কাঠামো: সার্কের সাংগঠনিক কাঠামো গুলো হলো-

রাষ্ট্র/সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন।
আটটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সহযোগীতায় মন্ত্রিপরিষদ বৈঠক।
আটটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের সচিবদের সহযোগে স্থায়ী কমিটি।
সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে স্থায়ী কমিটি।
কর্ম কমিটি।
সার্কের সহযোগীতার ক্ষেত্রসমূহ: ১৯৮৫ সালে জন্মলগ্ন থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ পর্যন্ত সার্কের ১৮টি শীর্ষসম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিগত শীর্ষ সম্মেলনে সার্কের সহযোগীতার বেশ কিছু ক্ষেত্র নির্ধারিত হয়েছে- সেগুলো হলো- * কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন * জৈব প্রযুক্তি * যোগাযোগ তথ্য এবং গণমাধ্যম * অর্থনীতি * সার্ক জ্বালানি * পরিবেশ * তহবিল গঠন * মানব সম্পদ উন্নয়ন * আইন সংক্রান্ত * জনগণের সাথে যোগাযোগ * দারিদ্র্য বিমোচন * বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি * সার্ক আলোচ্যসূচি * সার্ক আঞ্চলিক পরিবহন পর্যবেক্ষণ করা * সার্ক পর্যটন।

সার্কের মহাসচিববৃন্দ: প্রতিষ্ঠার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত মোট ১২ জন, সার্কের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সার্কের প্রথম মহাসচিব বাংলাদেশের জনাব আবুল আহসান এবং দ্বাদশ ও সর্বশেষ মহাসচিব হলেন নেপালের অর্জুন বাহাদুর থাপা।

সার্কের অঙ্গসংগঠন: ১৯৮৫ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময় চাহিদা পূরণের তাগিদে বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে। নিম্নে সার্কের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন ও সদর দপ্তরের নাম প্রদান করা হলো-
১. সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র- ঢাকা, বাংলাদেশ।
২. সার্ক কৃষি তথ্য কেন্দ্র- ঢাকা, বাংলাদেশ।
৩. সার্ক তথ্য কেন্দ্র - কাঠমুন্ডু, নেপাল।
৪. সার্ক যক্ষ্মা কেন্দ্র - কাঠমুন্ডু, নেপাল।
৫. সার্ক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র - কলম্বো, শ্রীলংকা।
৬. সার্ক উপকূলীয় এলাকা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র- মালে, মালদ্বীপ।
৭. সার্ক বন কেন্দ্র- থিম্পু, ভুটান।
৮. সার্ক মানবসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্র - ইসলামাবাদ, পাকিস্তান।
৯. সার্ক জ্বালানি কেন্দ্র - পাকিস্তান।
১০. সাউথ এশিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় - নয়াদিল্লী, ভারত।

সার্ক ও বাংলাদেশ: সার্ক প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য ঘাটতি মোকাবেলায় বাংলাদেশের সুপারিশ অনুযায়ী ‘Food Reserve System’ গড়ে তোলা হয়েছে। এছাড়া দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সপ্তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে সাপটা’ South Asian Preferential Trading Agreement (SAPTA) চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নারী ও শিশু পাচার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব সার্ক সম্মেলনে গৃহীত হয়েছে। এছাড়া সন্ত্রাস দমন ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সোচ্চার। ২০০৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ শীর্ষ সম্মেলন সার্কের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সম্মেলন। এ সম্মেলনে ২০০৬-২০১৫ সালকে দারিদ্র্যমুক্ত সার্ক দশকঘোষণাসহ ৫৩ দফা ঢাকা ঘোষণা গৃহিত হয়। এভাবে বাংলাদেশ সব সময়ই সার্ককে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে কার্যকরী সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলতে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সার্কের সফলতা ও ব্যর্থতা: দীর্ঘ আড়াই দশকে সার্ক সীমিত পরিসরে হলেও প্রশংসনীয় কাজ করেছে। যেমন - সন্ত্রাস দমনে সমঝোতা দলিলে স্বাক্ষর, আঞ্চলিক খাদ্য নিরাপত্তা সৃষ্টি, পরিবহন ও যোগাযোগ সহযোগীতা, জৈব প্রযুক্তি, পরিবেশ, আবহাওয়া, বনজসম্পদ এবং গণমাধ্যম সেক্টরে পারস্পরিক সহযোগীতা, SAPTA SAFTA গঠন ইত্যাদি। এছাড়া সার্ক কৃষি কেন্দ্র, সার্ক যক্ষ্মা কেন্দ্র, সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্র, সার্ক জ্বালানি কেন্দ্র, সার্ক বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি গঠন সার্কের সফলতার প্রতিচ্ছবি। তবে জনসংখ্যায় সার্ক বিশ্বের বৃহৎ আঞ্চলিক সংগঠন হলেও ASEAN এর মতো সফলতা অর্জন করতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে সার্কের ব্যর্থতার অন্যতম কারণ সদস্য দেশগুলোর আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক সহযোগীতা জোরদার করার ব্যাপারে অনীহা এবং পাক-ভারত, ভারত-চীন, ভারত-শ্রীলংকা সীমান্ত ও রাজনৈতিক বিরোধ।

উপসংহার: সার্ক জনসংখ্যায় যেমন সর্ববৃহৎ তেমনি জিডিপিতে বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম আঞ্চলিক সংগঠন। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে সার্ক তেমন সফলতা দেখাতে পারেনি। তবে ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সার্কের গতি ত্বরান্বিত হবে এ বিষয়ে সবাই আশাবাদী। সুতরাং ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে সকল গ্লানি ও প্রতিবন্ধকতা দূরীভূত করে সার্ক তার আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক সহযোগীতা জোরদার করার মাধ্যমে একটি কার্যকরী সংগঠনে পরিণত হবে।



No comments:

Post a Comment