Thursday, February 9, 2017

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ / আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম / স্বাধীনতা সংগ্রাম/ মুক্তিসংগ্রাম/ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মুক্তি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ / আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম / স্বাধীনতা সংগ্রাম/ মুক্তিসংগ্রাম/ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মুক্তি
 ভূমিকা
স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে /কে বাঁচিতে চায়
দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে /কে পরিবে পায়।
স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। যেকোনো জাতির প্রগতি, উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য স্বাধীনতা অপরিহার্য। কিন্তু হাজার বছরের আবহমান বাঙালিকে বিজাতি, বিভাষী দাসত্বের শৃঙ্খল পরিয়েছে কখনো বল প্রয়োগে, কখনো কৌশলে, কখনো প্রলোভনে। এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর মানচিত্রে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু স্বাধীনতার নেপথ্যে যে সংগ্রাম তার ইতিহাস যেমন ভয়াবহ তেমনি বেদনাময়।
পটভূমি
ইংরেজ বেনিয়াশক্তি ১৭৫৭ সনে পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতা হরণ করে প্রায় দীর্ঘ দুশ বছর দেশমাতৃকাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখে। শোষণ শাসনে, লুণ্ঠনে তারা ছিল সিদ্ধহস্ত কিন্তু বিশ শতকের বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজের জাগরণে ইংরেজ রাজত্ব ভারতবর্ষ থেকে বিদায় নিতে বাধ্য হয়।
১৯৪৭ সনে উদ্ভট অবৈজ্ঞানিক দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলা পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই বাংলা অভিহিত হল পূর্ব পাকিস্তান নামে। নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রটির পশ্চিমাঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের উপর ঔপনিবেশিক শাসনের তাণ্ডবে মেতে উঠে। রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, অর্থনীতিতে তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে বাঙালিকে শোষণ ও অত্যাচারে মেতে ওঠে। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে তারা বাঙালিকে হীনবীর্য করে তোলার অপপ্রয়াসে লিপ্ত হয়। কিন্তু বাঙালি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী হয়ে উঠতে থাকে। পাকিস্তানি শাসকচক্র বাঙালির মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিতে অস্বীকার করে বসে। কেননা তারা জানতো বাঙালিকে নিঃশেষ করতে হলে তার ভাষা ও সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিতে হবে। কিন্তু পাক শাসক চক্রের এ অশুভ পরিকল্পনা উপলব্ধি করতে পেরে ১৯৫২ সনের ২১ ফেব্রুয়ারি বাঙালি দামাল ছেলেরা ঢাকার রাজপথে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে স্বাধিকার সংগ্রামের প্রথম সোপান রচনা করে।
বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে বাঙালি উপলব্ধি করতে পারে স্বাধীনতা ব্যতীত তার গত্যন্তর নেই। এই স্বাধিকারের লক্ষ্যেই ১৯৬৬ সনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছয়দফা কর্মসূচি গ্রহণ করেন। গণবিক্ষোভের প্রেক্ষাপটকে ধ্বংস করতে শাসকচক্র ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত সামরিক শাসন অব্যাহত রাখে। মুক্তিকামী জনগণের উপর চলতে থাকে নির্মম অত্যাচার, রাজনৈতিক কর্মীদের বন্দি করা হয়; আইউব খাঁন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে আন্দোলনের চাপে ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল বন্দিকে মুক্তি দিতে বাধ্য হন।
বজ্রকণ্ঠের গর্জন
১৯৭০ সালের নির্বাচনে ৬ দফার স্বাধিকার দাবির ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। বাংলার মানুষের এই বিজয়কে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী সরকার নস্যাৎ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। ১৯৭১ সনের ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গণপরিষদ অধিবেশন স্থগিত করার সাথে সাথেই গোটা পূর্ববাংলা গর্জে উঠে। তখন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১-এর ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ সংগ্রামী জনতার সামনে বাংলাদেশের মুক্তি তথা স্বাধীনতার অভিপ্রায় বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন:
এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম
বজ্রকণ্ঠের সেই গর্জনে বাংলার ঘরে ঘরে বেজে উঠতে থাকে যুদ্ধের দামামা। সারা বাংলাদেশে শ্লোগান উঠে-
বীর বাঙালি অস্ত্র ধর
বাংলাদেশ স্বাধীন কর।
সমগ্রদেশ বারুদের মতো জ্বলে উঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে, সমগ্র বাঙালি জাতি স্বাধীনতার প্রত্যাশায় ঐক্যবদ্ধ হয়। এ সময় বাঙালির জাতীয়তাবাদকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার দীর্ঘদিন যাবৎ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আপস আলোচনার প্রহসন চালায়।
কালরাত্রি
একদিকে আলোচনার নামে প্রহসন, অন্যদিকে সে আলোচনার অন্তরালে পশ্চিম পাকিস্তানিরা পশ্চিম পাকিস্তান থেকে প্রচুর সৈন্য ও অস্ত্র পাঠাতে থাকে। প্রেরিত অস্ত্র ও সৈন্য নিয়ে ২৫ মার্চের কালো রাত্রিতে আকস্মিকভাবে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির উপর। সমস্ত রাত হানাদার বাহনী পৈশাচিক উল্লাসে মেতে উঠে। হাজার হাজার প্রাণ রাতের আঁধারে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। নিরীহ জনতার এতো রক্ত দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। পথচারী, ঘুমন্ত নারী কি শিশু, ছাত্রাবাস, মসজিদ, মন্দির ঘাতকদের ঝকঝকে অস্ত্রের সামনে কোনো মূল্যই পেলো না। ঢাকা পৃথিবীর সেরা কসাইখানায় পরিণত হলো।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র
২৬ মার্চ ১৯৭১। দুপুর প্রায় দুটোর সময় তখনকার চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্র থেকে দখলদার বাহিনীকে সর্বশক্তি দিয়ে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বান প্রচারিত হল। এই নির্ভীক কণ্ঠ তৎকালীন চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হান্নানের। ঐদিন রাতেই চট্টগ্রামে বিলিকৃত বঙ্গবন্ধুর ইংরেজি হ্যান্ডবিলের বঙ্গানুবাদ তৎকালীন ফটিকছড়ি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম সন্দ্বীপ পড়ে শোনাল। বঙ্গবন্ধুর বাণীর কিছু অংশ নিম্নরূপ :
পাকিস্তানি বাহিনী আকস্মিকভাবে পিলখানা ইপিআর ঘাঁটি, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আক্রমণ চালিয়েছে এবং নাগরিকদের হত্যা করেছে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের রাস্তায় রাস্তায় যুদ্ধ চলছে। আমি বিশ্বের জাতিসমূহের কাছে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি। আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে চলেছে। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে আমি আপনাদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি এবং নির্দেশ দিচ্ছি যে, দেশকে মুক্ত করার জন্য শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে যুদ্ধ করুন। আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন।
জয় বাংলা
শেখ মুজিবুর রহমান
গোটা জাতি যখন ইয়াহিয়া খানের লেলিয়ে দেওয়া হানাদার বাহিনীর খপ্পরে নিষ্পেষিত এবং নির্যাতিত সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের জন্ম। যুদ্ধকালীন সময়ে এই কঠিন নয় মাস উৎসাহ, উদ্দীপনা এবং প্রেরণা যুগিয়েছে এই বেতার কেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিমেয় উৎসাহ দিয়েছে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিবিসি; ভয়েস অব আমেরিকা প্রভৃতি মাধ্যমেই গোটা পৃথিবীতে প্রচার হয়ে যেতো খুব সহজেই।

স্বাধীনতা ঘোষণা
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১৯৭১ সনের ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা জিয়াউর রহমানকে দিয়ে বিশ্ববাসীকে পাঠ করে শুনান।
এই প্রচার গোটা জাতিকে আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্রে, শত্রুর বিপক্ষে মরিয়া হয়ে আঘাত হানার ক্ষেত্রে এবং ঐক্যবদ্ধ হতে প্রভূত সাহায্য করেছিল।
মুজিবনগর সরকার
১৯৫৭ ২৩ জুন পলাশির আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতা সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। কাছাকাছি আরেক আম্রকানন, রণাঙ্গণের কাছেই, শান্ত, স্নিগ্ধ, খাঁটি জীবনানন্দীয় একটি গ্রাম বৈদ্যনাথতল্য। ১৯৭১, ১৭ এপ্রিল, শনিবার আজ থেকে এই গ্রামটির নাম হল মুজিবনগর। জন্ম নিলো নতুন একটি রাষ্ট্র, বাংলাদেশ। নতুন সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার।
নতুন সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে (তিনি তখন পাঞ্জাবের লারকানা জেলে বন্দি) মন্ত্রিসভার নাম ঘোষণা করেন।
অস্থায়ী মন্ত্রিসভা নিম্নরূপ
রাষ্ট্রপতি: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, উপ রাষ্ট্রপতি: সৈয়দ নজরুল ইসলাম [রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।], প্রধানমন্ত্রী: তাজউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্র, সংসদ ও আইনমন্ত্রী: খন্দকার মুশতাক আহম্মদ, অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী: জনাব এম. মনসুর আলী, স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুণর্বাসনমন্ত্রী: এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান।
নবগঠিত বাংলাদেশ সরকারের অধীনে মুক্তিপাগল ছাত্র-জনতা গড়ে তোলে মুক্তিবাহিনী। ইয়াহিয়া খানের অপারেশন ব্লিজবাংলাদেশের মানুষকে হতবুদ্ধি করে দিলেও মনোবল ভাঙতে পারে নি। স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ছুটি ভোগরত সৈনিক, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক, সশস্ত্র পুলিশ, আনসার, ছাত্র-যুবক-জনতা পাক হানাদার প্রতিহত এবং দেশ থেকে সম্পূর্ণ উৎখাত করতে মরণপণ লড়াইয়ে নেমে যায়।
পৃথিবীর ইতিহাসে যে কয়টি সশস্ত্র বিপ্লব হয়েছে তাতে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, প্রথমে অর্গানাইজ করা হয়েছে এবং পরবর্তীতে ঘোষিত হয়েছে বিদ্রোহ, অতঃপর বিপ্লব। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ঘটেছে সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রথমে ঘোষিত হয়েছে বিদ্রোহ, পরে হয়েছে সংগঠন।
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ এগারোটি সেক্টরে বিভক্ত হল। সেনাবাহিনীর অফিসাররা এসব সেক্টরের কমান্ড গ্রহণ করলেন। দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী সংগঠিত হল। গেরিলা যুদ্ধ পদ্ধতি হচ্ছে চোরাগোপ্তা অতর্কিত আক্রমণ এবং পলায়ন। সম্মুখ যুদ্ধ এবং গেরিলা আক্রমণের মাধ্যমে সমগ্র বাংলাদেশে মুক্তিবাহিনী পাক বাহিনীকে পর্যুদস্ত করতে থাকে। দেশের সমস্ত শহর ও গ্রামঞ্চলই পরিণত হয় যুদ্ধক্ষেত্র। এ যুদ্ধের আক্রমণে দিশেহারা হয়ে উঠে পাকিস্তানি বাহিনী। পাকিস্তানের রণ উন্মত্ততাকে সহায়তা করে আমেরিকা ও চীন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে সরাসরি সমর্থন করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সাহায্যের মাধ্যমে রাশিয়া বাংলাদেশ ও ভারত সরকারকে অনুপ্রাণিত করে।
চীন-আমেরিকার অস্ত্র-গোলা বারুদসহ বিভিন্ন প্রকার সাহায্যপুষ্ট হয়েও ইয়াহিয়া এবং তার সমর নায়কেরা ক্রমশ পিছু হটতে লাগল। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম বিজয়ের দিকে অগ্রসর হতে লাগল।
গেরিলারা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তাদের চোরাগোপ্তা আক্রমণ ও নাশকতামূলক কার্য অব্যাহত রেখেছেন। প্রতি রাতে তাদের অতর্কিত আক্রমণ টের পাওয়া যাচ্ছে, উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তাদের বোমার শব্দে পাকিস্তানিরা কম্পমান। একটির পর একটি জাহাজ ধ্বংস করছে, পুল উড়িয়ে দিয়ে যোগাযোগ বিছিন্ন করে দিচ্ছে, পাওয়ার স্টেশন অকেজো করে দিচ্ছে।
পর্যুদস্ত পাকবাহিনী
পাক হানাদার বাহিনী মহাবিপদে পড়ল। তারা মুক্তিবাহিনীর হাতে ভীষণভাবে পর্যদুস্ত হতে লাগল। তারা কোনো কোনো স্থান থেকে পালিয়ে বাঁচল, কোনো কোনো স্থানে নিরপরাধ গ্রামবাসীদের উপর অত্যাচার করল এবং গ্রামের পর গ্রাম, হাট বাজার সম্পূর্ণরূপে বিধ্বস্ত করল। অবশেষে মুক্তিবাহিনীর প্রবলচাপের মুখে তাদের মনে ভীতির সঞ্চার হল এবং মনোবল সম্পূর্ণরূপে ভেঙে গেল।

যৌথ অভিযান
এর মধ্যে দিশেহারা পাকবাহিনী ভারত আক্রমণ করে বসল। ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১। ভারতীয় সময় বিকেল ৫টা ৪৭ মিনিটে পাকিস্তান বিমানবাহিনী ভারতের ৭টি বিমান ঘাঁটিতে অতর্কিতে হামলা চালায়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধি কলকাতায় ছিলেন। তিনি দিল্লি ফিরেই রাত ১২টা ৩০ মিনিটে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণে আক্রমণের নির্দেশ দেন। চারদিক দিয়ে ভারত ও মুক্তিবাহিনীর যৌথ অভিযান শুরু হয়। মিত্র বাহিনীর সৈন্যরা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে।
আত্মসমর্পণ
অবশেষে একাত্তরের ষোলোই ডিসেম্বর পাক সামরিক চক্র তিরানব্বই হাজার সৈন্য সহ রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ-ভারতের সম্মিলিত মিত্র বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই রমনা রেসকোর্সেই ৭ মার্চ-এ স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন আর ষোলোই ডিসেম্বর ওই রেসকোর্স ময়দানেই পাকহানাদার বাহিনীর আত্মসর্ম্পণের মধ্যে দিয়ে দুইশত ২৪ বছরের স্বপ্ন বাংলাদেশের রক্তমাখা পতাকা উড্ডীন হল। দেশ হল হানাদার মুক্ত। জেনারেল নিয়াজি এক এক করে নিজ পোশাক থেকে সবগুলো সামরিক ব্যাজ খুলে ফেলে অবনত মুখে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করলেন।
বীরশ্রেষ্ঠদের কথা
স্বাধীনতা আমাদের আবহমানকালের স্বপ্ন-সাধনা। সেই স্বাধীনতাকে আমরা লাভ করলাম ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে আমাদের সমগ্র জাতির যেমন অবদান রয়েছে, তেমনি আমাদের বীরশ্রেষ্ঠদের অবদানও অপরিসীম। তাঁরা আমাদের ঐতিহ্য এবং আমাদের গর্ব। আমাদের সম্মুখে এগিয়ে চলার পাথেয় হয়ে থাকবে তাঁদের মৃত্যুঞ্জয় স্মৃতি। তাঁরা আছেন আমাদের নিশ্বাসে-বিশ্বাসে, আমাদের রক্তধারায়। বীর শহীদদের মধ্যে যে সাতজন অমর শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তাঁরা হলেন:
সিপাহি মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল, ল্যান্সনায়েক মুন্সি আবদুর রউফ, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান, ল্যান্সনায়েক নূর মোহাম্মদ, সিপাহি হামিদুর রহমান, স্কোয়াড্রেন ইঞ্জিনিয়ার রুহুল আমিন এবং ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গির।

বুদ্ধিজীবী নিধন
১৪ ডিসেম্বর শেষরাতে পাকবাহিনীর এদেশীয় দালাল-রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীর লোকজন বাড়ি বাড়ি গিয়ে হানা দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে যায়। পাকহানাদার চক্র যখন আত্মসমর্পণ করে ঠিক তখনই বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করার ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেন রাও ফরমান আলী। ১৯৭১ এর ৯ আগস্ট এই জঘন্য হত্যাযজ্ঞের নীল নকশা তৈরি করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর যে সব বুদ্ধিজীবীকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল পাকবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকারবাহিনী, তাদের সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। মিরপুরে, রায়ের বাজারের বধ্যভূমিতে পাওয়া গেল অসংখ্য মৃতদেহ, কারো চোখ ওপড়ানো, কারো হাত পেছনে বাঁধা, কারো নাক কান কাটা। নৃশংসভাবে নিহত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন- মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, ডাক্তার রাব্বি, আনোয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমদ, ডাক্তার মুর্তাজা, নিজামুদ্দীন, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, সন্তোষ ভট্টাচার্য শহীদুল্লাহ কায়সার, জহির রায়হান প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধে ছাত্র সমাজ
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজ বিস্ময়কর ভূমিকা পালন করেছে। জাতি তাদের কথা কখনো ভুলবে না। মুক্তিবাহিনীতে শতকরা ৭০ ভাগই ছিল ছাত্রসমাজ। পূর্বের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও শুধু দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়েই তারা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। যুদ্ধ করতে গিয়ে বহু ছাত্রকে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে। বুকের রক্ত দিয়ে ছাত্রসমাজ বাংলাদেশের পরাধীনতার অপবাদ দূরীভূত করেছে। বাংলাদেশের এ ইতিহাসে ছাত্রসমাজের এ অবদানের কথা চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লিপিবদ্ধ থাকবে।
উপসংহার
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
শহরের বুকে জলপাই রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মতো চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা
ছাত্রাবাস, বস্তি উজাড় হলো। রিকয়ললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
আমরা পর্বত প্রমাণ বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। স্বাধীনতা অর্জনের পর উনচল্লিশ বছর অতিক্রান্ত হতে চলল। কিন্তু স্বাধীনতার প্রকৃত স্বপ্ন এখনো বাস্তবায়ন হয় নি। বরং স্বাধীনতা ও বাঙালির সংস্কৃতি বিরোধী একটি চক্র দিন দিন মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। আবারো পবিত্র ধর্ম ব্যাবহার করে আত্মঘাতি জঙ্গি বাহিনী গঠন করে দেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করার কাজে প্রকাশ্যে লিপ্ত রয়েছে সেইসব পরাজিত শত্রুরা। রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। স্বধীনতার মূল্যবোধ ঊর্ধে তুলে ধরতে হবে। শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকার এবং মুক্তিযুদ্ধের চার মূলনীতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করতে হবে। এর জন্য সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কর্মমুখর হয়ে উঠতে হবে।


No comments:

Post a Comment